শান্তির নোবেল, নোবেলের অশান্তি

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
শান্তির নোবেল, নোবেলের অশান্তি

 ডেস্ক রিপোর্টঃ

নোবেল শান্তি পুরস্কার একসময় যুদ্ধ থামানোর নৈতিক প্রতীক ছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই পুরস্কারই ক্রমশ পরিণত হচ্ছে ক্ষমতার দরকষাকষি, ব্যক্তিগত লোভ ও ভূরাজনৈতিক আগ্রাসনের হাতিয়ারে।

নোবেল শান্তি পুরস্কার কি বিশ্বযুদ্ধের কারণ হতে পারে? বিংশ শতাব্দীতে এমন প্রশ্ন হাস্যকর শোনাত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দী অন্যরকম। এই শতাব্দীতে হাসি কান্নায় রূপ নেয়, কান্না হাসিতে; হালকা গভীরে, গভীর হালকায়; সত্য মিথ্যায় আর মিথ্যা সত্যে। ভণ্ড সাধু হয়ে ওঠে, সাধু ভণ্ডে পরিণত হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন এই রূপান্তরের পূর্বাভাসই দিয়েছিলেন—

“তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।”

আজ আমরা তার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

রবীন্দ্রনাথের দুষ্টুমি এখন আরও স্পষ্ট। ১৯০৫ সালে তিনি এক বাউল কবির গান নকল করে লিখে ফেললেন ‘আমার সোনার বাংলা’। কেউ তাকে জাতীয় সংগীত লেখার অনুরোধও করেনি। তবু তিনি লিখলেন—গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল। শুধু তাই নয়, গানটিকে আমাদের গিলিয়ে দিতে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও বাগিয়ে নিলেন। এমন কৌশলে গানটি রচনা করলেন যে জাতীয় সংগীতের সব উপাদান সেখানে ঢুকে গেল। ফলে এর চেয়ে ভালো বহু গান থাকলেও সেগুলো আর আমাদের মনে ধরছে না।

‘আমার সোনার বাংলা’ না থাকলে বাঙালি ঠিকই একটি জাতীয় সংগীত বানিয়ে নিত। কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি বাংলা সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার পথটিও কার্যত বন্ধ করে দিলেন। লক্ষণীয়, এরপর বাঙালি নোবেল পেল—শান্তিতে, অর্থনীতিতে—কিন্তু সাহিত্যে আর নয়। বাংলা সাহিত্যের স্বার্থে তাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা কম হয়নি। পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত আধুনিক পাঁচ কবিও ব্যর্থ হয়েছেন। এখন কবিদের ওপর ভরসা নেই—তাই মাঠে নামানো হয়েছে অ্যাক্টিভিস্টদের, তাদের মাথায় বসানো হয়েছে পাণ্ডিত্যের ধ্বজাধারীদের।

সাহিত্যে নয়, তবে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়ে আবার বিশ্বকে চমকে দিয়েছি—অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু এই শান্তির নোবেলই তার জীবনে অশান্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। কারণ একই পুরস্কারের স্বপ্ন দেখছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, পরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়—দুবারই প্রত্যাশা ছিল নোবেলের। ফলাফল—ইউনূসের ওপর নেমে আসে সীমাহীন নিপীড়ন। তাকে পদ্মায় চুবানোর আগেই অবশ্য গণজোয়ারে ভেসে যান শেখ হাসিনা।

নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে এবার উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বারাক ওবামা এই পুরস্কার পাওয়ায় তার ক্ষোভ চেপে রাখা যায়নি। ওবামা যা পেয়েছেন, ট্রাম্পের চাই তা-ই, বরং আরও বেশি। বিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তিনি ব্যবহার করেছেন দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। কেউ কেউ ঘুষ হিসেবেও নোবেল দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু একবার ঠকে যাওয়ার পর নোবেল কমিটি ট্রাম্পকে আর পুরস্কার দিতে সাহস করেনি।

বরং তারা যেন আরও উসকানি দিয়ে নোবেল দিল ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে—ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও পদলেহী হিসেবে পরিচিত একজনকে। এর ফল ভেনেজুয়েলার জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। যে ব্যক্তি নিজের দেশের বিরুদ্ধে বিদেশি হস্তক্ষেপ চায়, গণহত্যাকারী নেতার কাছে সামরিক সহায়তা ভিক্ষা করে—তার হাতে শান্তির নোবেল বিস্ময়করই বটে।

চতুর মাচাদো নোবেল উৎসর্গ করলেন ট্রাম্পকে। এতে ট্রাম্পের ক্ষতস্থানে যেন নুনের ছিটা পড়ল—তার স্বপ্নের পুরস্কার কিনা অন্যের হাতে! প্রতিক্রিয়ায় তিনি মধ্যযুগীয় ডাকাতের মতো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে এলেন। বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্প এখন মাস্তান বাহিনীর স্বীকৃত নেতা।

মাদুরোর অপরাধ একটাই—তিনি হুগো শাভেজের পথ অনুসরণ করে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ রক্ষা করেছেন। ট্রাম্পের ‘তেল, তেল, তেল’ প্রলাপ তাই সীমাহীন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন—এখন থেকে তিনিই ভেনেজুয়েলা চালাবেন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি মধ্যযুগের পর আবার প্রতিষ্ঠা পেল।

মাচাদো ভেবেছিলেন নোবেল তার ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হবে। কিন্তু ট্রাম্প একসময় তাকালেনই না তার দিকে। উল্টো বললেন—দেশের মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। তবু মাচাদো দৌড়ে গেলেন হোয়াইট হাউসে, নোবেল তুলে দিয়ে বললেন—“এটি ভেনেজুয়েলাবাসীদের জন্য ঐতিহাসিক দিন।” ট্রাম্পও লজ্জাহীনভাবে পুরস্কার নিলেন। বললেন—“এটি পারস্পরিক সম্মানের নিদর্শন।” সেদিন তারা দুজন বিশ্ববেহায়াদের যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হলেন।

নোবেল কমিটি জানাল—পদক হস্তান্তর করা যায়, সম্মান নয়। অর্থাৎ মাচাদো যতই চেষ্টা করুন, নোবেল ট্রাম্পের হবে না। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।

নরওয়েজিয়ান পিপলস এইডের মহাসচিব রেমন্ড জনসন লিখেছেন, “এটি অবিশ্বাস্যরকম বিব্রতকর এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের জন্য ক্ষতিকর। নোবেল এখন এতটাই রাজনীতিকৃত যে এর বিরুদ্ধে শান্তি পুরস্কার-বিরোধী আন্দোলনও জন্ম নিতে পারে।”

এই অবস্থায় ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিচ্ছেন, ইরান আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, মেক্সিকো ও কানাডাকে চোখ রাঙাচ্ছেন। তার স্থান হওয়ার কথা হেগে, অথচ ক্ষমতার লোভে তিনি আরও দেশের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন। অনেকেই এই লোভের মাঝেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আভাস দেখছেন।

শান্তির নোবেল আজ তাই শান্তির নয়—অশান্তির প্রতীক।

বা/মে২৪/ফা