অ্যালবিনিজম ও ভিটিলিগোর তারতম্য
অ্যালবিনিজম (Albinism) হলো একটি বংশগত (Genetic) অবস্থা, যেখানে শরীরে মেলানিন (Melanin) নামক রঞ্জক পদার্থ স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কম থাকে বা একেবারেই থাকে না।
মেলানিন আমাদের ত্বক, চুল ও চোখের রং নির্ধারণ করে। তাই অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাধারণত—
ক) ত্বক অনেক ফর্সা বা সাদা হয়।
খ) চুল সাদা, সোনালি বা হালকা রঙের হয়।
গ) চোখের রং হালকা নীল, ধূসর বা বাদামি হতে পারে।
ঘ) দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকতে পারে।
ঙ) সূর্যের আলোতে ত্বক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
জেনে রাখা দরকার- এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়। একজনের কাছ থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায় না। এটি মূলত জিনগত কারণে হয়ে থাকে।
অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। যথাযথ চোখের চিকিৎসা, সানস্ক্রিন ব্যবহার, সূর্য থেকে সুরক্ষা এবং সামাজিক সহায়তা পেলে তারা পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য কাজে স্বাভাবিকভাবে অংশ নিতে পারেন। বিশ্বের অনেক স্থানে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বৈষম্য, কুসংস্কার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাদের বিষয়ে আমাদের সচেতনতা জরুরী।
আমরা জানি, মানুষের বৈচিত্র্যই পৃথিবীকে সুন্দর করে তুলেছে। কারো গায়ের রং শ্যামলা, কারো ফর্সা, কারো কালো আবার কেউ জন্মগ্রহণ করে এক বিশেষ জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে। অ্যালবিনিজম এমনই একটি বৈশিষ্ট্য, যা একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। কিন্তু এই ভিন্নতা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি মানব বৈচিত্র্যের একটি স্বাভাবিক অংশ।
অনেক মানুষ ভুলভাবে অ্যালবিনিজমকে রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন। বাস্তবে এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয় এবং একজন মানুষের কাছ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়ায় না। এটি মূলত জিনগত কারণে হয়ে থাকে এবং জন্মের সময় থেকেই এর উপস্থিতি দেখা যায়।
অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত সমস্যা। অনেকের চোখ সূর্যের আলোতে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয় এবং দূরের বস্তু স্পষ্টভাবে দেখতে অসুবিধা হয়। এছাড়া মেলানিনের ঘাটতির কারণে তাদের ত্বক সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। তাই তাদের জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার, ছাতা বহন এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
অ্যালবিনিজম এবং ধলা রোগ বা ভিটিলিগো এক জিনিস নয়।
অ্যালবিনিজম:
ক) এটি জন্মগত বা বংশগত অবস্থা।
খ) জন্ম থেকেই ত্বক, চুল ও চোখে মেলানিন কম বা অনুপস্থিত থাকে।
গ) সাধারণত পুরো শরীরেই এর প্রভাব দেখা যায়।
ঘ) দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও থাকতে পারে।
ভিটিলিগো:
এটি একটি ত্বকের রোগ, যেখানে শরীরের কিছু অংশে সাদা দাগ দেখা যায়।
ক) জন্মের পর যেকোনো বয়সে শুরু হতে পারে।
খ) পুরো শরীর নয়, নির্দিষ্ট স্থানে সাদা দাগ হয়।
গ) চুল ও চোখ সাধারণত স্বাভাবিক থাকে (যদিও আক্রান্ত স্থানের চুল সাদা হতে পারে)।
অ্যালবিনিজম হলো জন্মগত রঞ্জকতার ঘাটতি, আর ধলা রোগ (ভিটিলিগো) হলো ত্বকের কিছু অংশে রং হারিয়ে যাওয়া। দুটির কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা ভিন্ন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের অনেক স্থানে অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত মানুষ সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্যের শিকার হন। অনেক সময় তাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচলিত থাকে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ তারা অন্য সবার মতোই স্বপ্ন দেখতে, শিক্ষা গ্রহণ করতে, কর্মজীবনে সফল হতে এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন মানুষের মূল্য তার ত্বকের রং বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানবিক গুণাবলি, জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও কর্মই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মূল্যবান করে তোলে। অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত মানুষদের প্রতি সহানুভূতি নয়, বরং সম্মান ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
অ্যালবিনিজম কোনো অভিশাপ নয়, কোনো অপরাধ নয় এবং কোনো সংক্রামক রোগও নয়। এটি মানব বৈচিত্র্যের একটি স্বাভাবিক জিনগত অবস্থা। সচেতনতা, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যেখানে ভিন্নতা নয়, মানুষই হবে পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি।
ধলা রোগ বা ভিটিলিগো একটি ত্বকের রোগ, যেখানে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানের মেলানোসাইট (Melanocyte) কোষ নষ্ট হয়ে যায় বা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে ঐ স্থানের ত্বকে সাদা দাগ দেখা দেয়।
ভিটিলিগো— জন্মগত নয়। যেকোনো বয়সে হতে পারে। শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে সাদা দাগ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করতে পারে। সাধারণত চোখের সমস্যা সৃষ্টি করে না।
উভয় ক্ষেত্রেই ত্বকের রং ফ্যাকাশে বা সাদা দেখায় বলে অনেকেই এগুলোকে একই মনে করেন। কিন্তু অ্যালবিনিজমে পুরো শরীরের রঞ্জকতার ঘাটতি থাকে, আর ভিটিলিগোতে কেবল নির্দিষ্ট স্থানে সাদা দাগ হয়।
এখন পর্যন্ত অ্যালবিনিজমের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই, কারণ এটি জিনগত অবস্থা। তবে চোখের যত্ন ও সূর্য থেকে সুরক্ষা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
অন্যদিকে ভিটিলিগোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে, যেমন—
ওষুধ
ফটোথেরাপি
কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার।
লেখক:
ওমায়ের আহমেদ শাওন









