সামান্য দুই পেরেক বদলে দিল রফিকের ভাগ্য

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
সামান্য দুই পেরেক বদলে দিল রফিকের ভাগ্য

সংগৃহীত

মো. আরিফুল ইসলাম, পাবনা জেলা প্রতিনিধি


এক গ্রামে রফিক নামে এক লোক বাস করতেন। তিনি কোনো জিনিসকেই তুচ্ছ মনে করতেন না। চোখে যা পড়ত, যত্ন করে তা গুছিয়ে রাখতেন। রাস্তায় কাচের টুকরো, লোহার টুকরো কিংবা অন্য কোনো জিনিস পড়ে থাকতে দেখলে সেগুলো কুড়িয়ে পকেটে রাখতেন।


একদিন তিনি এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেলেন। তার বন্ধু সেদিন শহর থেকে ফিরেছিলেন। শহরে কীভাবে টাকা উপার্জন করেছেন, সেই গল্প বন্ধুটি রফিককে শোনালেন। বন্ধুর কথা শুনে রফিকেরও শহরে গিয়ে টাকা রোজগারের ইচ্ছা হলো। কারণ, ফেরি করে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে তার সংসার ঠিকমতো চলত না।


একদিন রফিক শহরের উদ্দেশে রওনা হলেন। হাতে টাকা না থাকায় কিছু চিড়া-মুড়ি বেঁধে নিয়ে হেঁটেই চললেন শহরের পথে।


পথে যেতে যেতে হঠাৎ তার পায়ে কিছু একটা লাগল। নিচু হয়ে দেখলেন, রাস্তায় দুটি পেরেক পড়ে আছে। নিজের অভ্যাসমতো পেরেক দুটি যত্ন করে তুলে পকেটে রাখলেন।


সন্ধ্যার দিকে তিনি একটি জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় দেখলেন, তার সামনে দিয়ে একটি ছেলে সাইকেল চালিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। তার পেছনে একটি বেবিট্যাক্সিতে করে দুজন লোকও আসছে।


রফিক ভাবলেন, এমনভাবে কত মানুষই তো চলাচল করে! পয়সা থাকলে মানুষ কত রকমের গাড়িতে চড়তে পারে। আর তার টাকা নেই বলেই হেঁটে যেতে হচ্ছে।


আরও কিছুদূর যাওয়ার পর রফিক দেখলেন, একটি ঘোড়ার গাড়ি কাত হয়ে পড়ে আছে। তিনি কাছে গিয়ে গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কী হয়েছে?’


কোচোয়ান বললেন, ‘গাড়ির চাকার পেরেক খুলে গেছে।’


রফিক তখন পকেট থেকে পেরেক দুটি বের করে বললেন, ‘এই দুটি পেরেক আমার কাছে আছে। এগুলো দিয়ে হবে?’


কোচোয়ান আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘খুব হবে!’


তারা দুজন মিলে পেরেক দুটি দিয়ে গাড়িটি ঠিক করে ফেললেন। উপকার পেয়ে কোচোয়ান বললেন, ‘ভাই, তুমি আমার এত উপকার করলে। তোমাকে কী দেব? এই দুটি টাকা নাও।’


রফিক টাকা নিতে রাজি হলেন না। বললেন, ‘না, না, আমি টাকা নেব না।’


কোচোয়ান আবার বললেন, ‘তাহলে তোমাকে কী দেব? আমি শহরে গেলে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। কিন্তু আমি তো এখন উল্টো দিকে যাচ্ছি।’


রফিক জানালেন, তাকে কিছুই দিতে হবে না। তবে কোচোয়ানের গাড়িতে এক ছড়া কলা ও অনেকগুলো পেয়ারা ছিল। রফিক আপত্তি করলেও কোচোয়ান তাকে সেগুলো দিয়ে দিলেন।


ফলগুলো নিয়ে রফিক আবার সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এমন সময় তিনি জঙ্গলের ভেতর থেকে একটি শিশুর কান্না শুনতে পেলেন। তার মনে হলো, কোনো শিশু হয়তো হারিয়ে গেছে।


তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘কে কাঁদে ওখানে?’


তার কণ্ঠ শুনে এক নারী দুই শিশুকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন।


রফিক জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের কী হয়েছে?’


নারীটি বললেন, ‘সকালে বেবিট্যাক্সিতে করে বাড়ি ফিরছিলাম। পথে দুজন লোক আমাদের গাড়ি থামিয়ে নামিয়ে দেয়। আমাদের কাছে যা ছিল, সব কেড়ে নেয়। ভয়ে আমরা জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে এসেছিলাম। এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কীভাবে বাড়ি ফিরব, বুঝতে পারছি না। ছেলে-মেয়ে দুটো ক্ষুধায় কাঁদছে।’


রফিক তাদের নিজের কাছে থাকা কলা ও পেয়ারা খেতে দিলেন। ক্ষুধার্ত মা ও দুই শিশু পেট ভরে ফল খেল।


তাদের বাড়ি খুব বেশি দূরে ছিল না। ওই নারীর স্বামী একজন ব্যবসায়ী। স্ত্রী ও সন্তানদের খুঁজে না পেয়ে তাদের বাড়িতে তখন কান্নাকাটি চলছিল।


হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী ও সন্তানদের ফিরে পেয়ে ব্যবসায়ী ভীষণ খুশি হলেন। তিনি রফিককে দুই-তিনটি টাকা দিতে চাইলেন। কিন্তু রফিক সেগুলোও নিতে রাজি হলেন না।


ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কিছুই নেবে না?’


রফিক বললেন, ‘না।’


তখন ব্যবসায়ী তার ঠিকানা লিখে নিয়ে বললেন, ‘তোমার ঠিকানাটা রেখে যাও।’


ঠিকানা দিয়ে রফিক আবার পথ চলতে শুরু করলেন।


কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি দেখলেন, যে ছেলেটিকে আগে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছিলেন, সে রাস্তার পাশে পড়ে কাতরাচ্ছে।


রফিক দ্রুত তার কাছে গিয়ে তাকে তুলে ধরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী হয়েছে? কে তোমাকে মেরেছে?’


ছেলেটি বলল, ‘দুজন লোক এসে আমার সাইকেল, ঘড়ি ও টাকাপয়সা সব কেড়ে নিয়েছে। আমি দিতে চাইনি বলে তারা আমাকে মেরেছে। আমি শহরের কাছাকাছি থাকি। এখন কীভাবে বাড়ি যাব?’


রফিক তাকে বললেন, ‘আমাকে ধরে ধরে চলো। আমি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।’


ছেলেটি রফিককে ধরে ধরে হাঁটতে লাগল। সেখান থেকে শহর প্রায় এক মাইল দূরে। অনেক কষ্ট করে রফিক ছেলেটিকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিলেন।


ছেলেটি ছিল এক ধনী ব্যক্তির সন্তান। ছেলেকে ফিরে পেয়ে তার বাবা রফিককে অনেক টাকা দিতে চাইলেন। কিন্তু রফিক এবারও টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালেন।


ছেলেটির বাবা বললেন, ‘তুমি টাকা রোজগারের জন্য শহরে থেকো না। তুমি এত ভালো মানুষ, শহরের লোক তোমাকে ঠকাবে। তুমি গ্রামে ফিরে যাও। সেখানে কাজ করো।’


পরদিন নিজের গ্রামে ফিরে রফিক অবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন, সেই ব্যবসায়ী, ঘোড়ার গাড়ির চালক এবং ধনী ব্যক্তিটি তার বাড়িতে বসে আছেন। তারা সঙ্গে করে অনেক কিছু নিয়ে এসেছেন।


কিন্তু রফিকের স্ত্রী কিছুই নিতে রাজি হলেন না। তিনি বারবার বলতে লাগলেন, ‘না সাহেব, আমরা গরিব মানুষ। এত দামি জিনিস দিয়ে আমরা কী করব?’


শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে টাকা দিয়ে রফিককে পাঁচ বিঘা জমি কিনে দিলেন। তারা বললেন, ‘রফিক, এই জমির দাম তুমি মাসে মাসে শোধ করে দিও।’


রফিক সেই জমিতে ধান চাষ করে ধীরে ধীরে জমির দাম পরিশোধ করলেন। এরপর আরও জমি কিনলেন।


এভাবে একসময় রফিক আর আগের মতো গরিব রইলেন না। নিজের পরিশ্রম, সততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে তিনি স্বচ্ছল হয়ে উঠলেন। সেই ব্যবসায়ী, ধনী ব্যক্তি ও ঘোড়ার গাড়ির চালকও তার বন্ধু হয়ে রইলেন।

গল্পটির প্রকাশনা-ইতিহাস

‘শিশু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তখন পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন জোবেদা খানম। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন হাশেম খান। তারেক রহমানের লেখা ‘সামান্য পেরেক’ গল্পটির জন্য ছবি এঁকেছিলেন সৈয়দ ইকবাল। সে সময় পত্রিকাটির মূল্য ছিল দুই টাকা।


এমকে/বিএম২৪