মেডিক্যালে আবার ভর্তি পরীক্ষার আগে আত্মঘাতী মেয়ের শোক নিয়ে মা–বাবা গেলেন যন্তর মন্তরে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অজস্র মানুষের ভিড়। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও কণ্ঠে স্লোগান। এই ভিড়ের মধ্যেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ জাফর হুসাইন ও তাঁর স্ত্রী হাবিব-উন-নিসা শেখ। তাঁরা রাজনৈতিক কর্মী নন। শিক্ষক নন, শিক্ষার্থীও নন। এমনকি আন্দোলনের সঙ্গে আগে কখনো তাঁদের কোনো সম্পর্কও ছিল না।
তবু এই দম্পতি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বানে চলমান যন্তর মন্তরের আন্দোলনে এসেছেন। তাঁদের এখানে নিয়ে এসেছে একটাই পরিচয়—তাঁরা এমন এক মেয়ের মা–বাবা, যে আর কোনো দিন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে না।
মেডিক্যালে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকার (নিট) পুনঃপরীক্ষার আগের দিন তাঁদের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে সানা শেখ আত্মহত্যা করেছেন। তাঁরা এসেছেন প্রশ্ন করতে, ‘আর কত শিক্ষার্থী এভাবে হারিয়ে যাবে?’
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা সানাকে গত ২০ জুন হায়দরাবাদের একটি অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এর পরদিন ছিল তাঁর নিট পুনঃপরীক্ষা।
পুলিশ জানিয়েছে, সানা আত্মহত্যা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৭০০ শব্দের একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। চিরকুটে সানা লিখেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি নিজের জীবন নিজেই শেষ করছি।’
তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, পড়াশোনার চাপ, ভালো ফল করার মানসিক চাপ এবং আগের পরীক্ষায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা তাঁর এই আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, গত বছর সানা নিট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
গত বছর নিটে সফল হতে না পারার পর আবারও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সানা। দীর্ঘমেয়াদি কোচিংয়েও ভর্তি হন তিনি। উচ্চমাধ্যমিকে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পাওয়া এই শিক্ষার্থী ২১ জুন আবার পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো স্বপ্ন ছুঁতে চেয়েছিলেন।
পরিবারের ভাষ্য, উচ্চমাধ্যমিকে ১০০০-এর মধ্যে ৯৮০ নম্বর পাওয়া মেয়েটি শেষ পর্যন্ত একটি ওঠানামা করা পার্সেন্টাইল স্কোরের কাছে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। পুরো চিরকুটজুড়ে সানা বারবার তীব্র উদ্বেগ, পরীক্ষা-সংক্রান্ত চাপ, ব্যর্থতার অসহনীয় ভয় এবং প্রত্যাশা পূরণের ব্যর্থতার কথা লিখেছেন।
তবে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থী সানা একা নন। ২১ জুনের নিট পুনঃপরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল এমন এক ডজনের বেশি পরীক্ষার্থী পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। সানার মৃত্যু দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সেই মর্মান্তিক ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট তীব্র চাপ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা পরীক্ষার্থীদের চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেয়েকে হারানোর এক মাসও পেরোয়নি। তবু শেখ জাফর ও হাবিব-উন-নিসা দিল্লিতে এসেছেন। তাঁদের বিশ্বাস, শুধু নিজের শোক বয়ে বেড়ালেই হবে না—এসব নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের পক্ষেও কাউকে দাঁড়াতে হবে।
শেখ জাফর বলেন, এনটিএর কারণে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য যাঁরা সোচ্চার হয়েছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো তাঁর দায়িত্ব।
আর সানার মা হাবিব-উন-নিসা বলেন, ‘আমি শুধু আমার মেয়ের জন্য যন্তর মন্তরে যাইনি। আমি সেখানে গিয়েছিলাম আত্মহত্যা করা আরও ২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্যও। সেখানে যাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছেন, তাঁরা আমাদের সন্তানদের জন্যই দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো তাঁরা আমাদের সন্তানদের কখনো চিনতেন না, কিন্তু তাঁদের জন্যই আজ তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন।’
এই দম্পতির আরও দুই মেয়ে আছে। তারা এখনো স্কুলে পড়ে। হাবিব-উন-নিসা বলেন, দিল্লিতে আসা যতটা সহজ ছিল, তার চেয়ে অনেক কঠিন ঘরে ফিরে শোকাহত দুই সন্তানকে বোঝানো, তাদের বড় বোন আর ফিরবে না।
নিজের শোকের কথাও এখনো পুরোপুরি ভাবার সুযোগ হয়নি জানিয়ে হাবিব-উন-নিসা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘এনটিএ নিজেদের ভুলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর খুব দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। তাহলে সরকারের ভুলের জন্য ভোটার হিসেবে আমাদেরও কি আবার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়?’
এরপরই যেন জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসে এই নারীর কণ্ঠে, ‘তারা এমন ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার কারণে এত শিক্ষার্থী মারা যাচ্ছে। আর কতজন শিক্ষার্থীকে তারা হত্যা করতে চায়? শিশুরা এমন চাপে আছে যে তারা ভেঙে পড়ছে। সরকারকে কেন কেউ প্রশ্ন করছে না? যদি তারা সরকার চালাতে না পারে, তাহলে তাদের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই।’
সূত্র: প্রথম আলো








