মা আমেনার কোলে সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০০ এএম
মা আমেনার কোলে সেই শিশু, যাঁর অপেক্ষায় ছিল পৃথিবী

সূত্রঃ সংগৃহীত

ধর্ম ডেস্ক


আরবের সমাজ তখন ধর্মীয় বিভ্রান্তি, গোত্রীয় সংঘাত ও নানা সামাজিক অনাচারে জর্জরিত। মক্কার পবিত্র কাবাঘরেও স্থাপিত হয়েছিল বহু মূর্তি। বংশ ও গোত্রের মর্যাদা ছিল সামাজিক অবস্থানের বড় মাপকাঠি, আর শক্তিশালীদের প্রভাবের কাছে দুর্বলরা প্রায়ই অধিকার হারাত। এমন এক সময় কোরাইশের বনু হাশেম পরিবারে জন্ম নেন মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)।


তবে তৎকালীন আরব সমাজে সাহস, অতিথিপরায়ণতা, উদারতা ও বাগ্মিতার মতো কিছু ভালো গুণও বিদ্যমান ছিল। মূল সংকট ছিল বিশ্বাস ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে। পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই মানুষদেরই এক আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়বিচার ও উত্তম চরিত্রের দিকে আহ্বান করেন।


জন্মের আগেই পিতৃহারা


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন বনু হাশেমের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর মা আমেনা বিনতে ওয়াহাব ছিলেন কোরাইশের বনু জুহরা গোত্রের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।


বিয়ের পর তাঁদের সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ব্যবসায়িক সফরে শামের উদ্দেশে যাওয়ার পথে আবদুল্লাহ ইয়াসরিবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। তখন আমেনা ছিলেন সন্তানসম্ভবা।


ফলে পৃথিবীতে আসার আগেই পিতাকে হারান মুহাম্মদ (সা.)। জন্মের পরও পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি।


সেই সোমবারের সকাল


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁর জন্ম যে সোমবার হয়েছিল, তা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত।


হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিন তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এ দিনই তাঁর ওপর ওহি নাজিল হয়েছে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)


মক্কার সেই সোমবারে জন্ম নেন মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে কাবাঘরে নিয়ে যান এবং ‘মুহাম্মদ’ নাম রাখেন। আরবি ভাষায় যার অর্থ প্রশংসিত।


আমেনার ঘরে সেই নবজাতক


জন্মের পর মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম আশ্রয় ছিলেন তাঁর মা আমেনা। পিতৃহারা এই শিশুকে ঘিরেই শুরু হয় তাঁর জীবনের প্রথম অধ্যায়।


তাঁর জন্মের সময় কিছু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনাও বিভিন্ন সীরাত ও হাদিসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে এসব বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা এক নয়। তাই যেসব ঘটনা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত, সেগুলো সেভাবেই এবং যেসব বর্ণনার সনদ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে উল্লেখ করাই যুক্তিসংগত।


মরুর কোলে শৈশব


তৎকালীন আরবের প্রচলন অনুযায়ী সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুদের অনেক সময় শহরের বাইরে মরু অঞ্চলের দুধমায়ের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠানো হতো। মুহাম্মদ (সা.)-কেও বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে পাঠানো হয়।


সেখানে তাঁর শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কাটে। মরুর নির্মল পরিবেশ ও বিশুদ্ধ আরবি ভাষার আবহে তিনি বেড়ে ওঠেন। হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারে তাঁর আগমনকে ঘিরে বরকতের বিভিন্ন বর্ণনাও সীরাতের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়।


ছয় বছরেই হারালেন মাকে


ছয় বছর বয়সে আমেনা তাঁকে নিয়ে ইয়াসরিবে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেন।


মায়ের মৃত্যুর পর ছোট্ট মুহাম্মদের দায়িত্ব নেন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর, আট বছর বয়সে দাদাকেও হারান তিনি। এরপর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালিব।


শৈশবের এই বেদনাময় অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর মানবিকতাকে আরও গভীর করে। এতিম ও অসহায় মানুষের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নের শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দুহা: ৬)


যে শিশু হয়ে উঠলেন ‘আল-আমিন’


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার কারণে মক্কার মানুষের আস্থা অর্জন করেন মুহাম্মদ (সা.)। নবুয়ত লাভের আগেই তিনি ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।


সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া ও উত্তম চরিত্র তাঁর ব্যক্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। নবুয়তের দায়িত্ব পাওয়ার পরও তাঁর এই গুণগুলো মানুষের প্রতি দাওয়াতের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।


আমেনার কোলে সেই শিশু


আমেনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশুর শৈশব ছিল বেদনায় পূর্ণ। জন্মের আগেই পিতাকে হারিয়েছেন, ছয় বছর বয়সে হারিয়েছেন মাকে, এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিবের ছায়াও সরে গেছে। চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে তিনি বড় হয়েছেন।


তবে ব্যক্তিগত জীবনের এসব কষ্ট তাঁকে মানুষের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। পরবর্তী সময়ে তিনি এতিমের অধিকার, দরিদ্রের মর্যাদা, প্রতিবেশীর হক, নারীর সম্মান এবং দুর্বল মানুষের নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।


আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া: ১০৭)


সেই শিশুর হাত ধরে নতুন পথ


চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। শুরু হয় নবুয়তের দায়িত্ব এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের নতুন অধ্যায়।


তিনি মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান। গোত্র, বংশ ও সম্পদের অহংকারের পরিবর্তে তাকওয়াকে মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরেন। এতিম, দরিদ্র, নারী ও দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেন। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, দয়া ও ন্যায়বিচারকে মানুষের চরিত্রের অপরিহার্য গুণ হিসেবে শিক্ষা দেন।


এভাবেই আমেনার ঘরে জন্ম নেওয়া সেই শিশু পরিণত হন আল্লাহর রাসুলে। তাঁর দাওয়াত আরব সমাজের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক জীবনে গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে।


যাঁর জীবন সর্বযুগে অনুসরণীয়


রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের কথা স্মরণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর জীবন ও আদর্শকে জানা এবং অনুসরণ করা। মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণ, দুর্বলদের প্রতি তাঁর মমতা, বিরোধীদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার এবং ক্ষমতার সময়ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত—সবই তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।


তাঁর জন্ম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব শুধু জন্মের ঘটনায় নয়; বরং তাঁর নবুয়ত, চরিত্র, দাওয়াত এবং মানবতার জন্য রেখে যাওয়া আদর্শে।


আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব: ২১)


আমেনার কোলে জন্ম নেওয়া সেই শিশু তাই শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের নাম নন। একজন মুসলমানের জন্য তাঁর জীবন বিশ্বাস, চরিত্র ও আচরণের সর্বোত্তম অনুসরণীয় আদর্শ।



এমকে/বিএম২৪