ভূরুঙ্গামারীতে সার লুট: দুই তদন্ত কমিটি, উদ্ধার ১২২ বস্তা

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৬ এএম
ভূরুঙ্গামারীতে সার লুট: দুই তদন্ত কমিটি, উদ্ধার ১২২ বস্তা

সূত্রঃ সংগৃহীত

শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি


কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার সংকটের মধ্যে ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার লুটের ঘটনায় প্রশাসনে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ঘটনার পর পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১২২ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি সার উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ জানান, সার লুটের ঘটনার পরদিন রাতে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমিটির সদস্যসচিব। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার।


সোমবার বিকেলে স্থানীয় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে তা দ্রুত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে সার ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তাইফুর রহমান মুকুলের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার লুটের ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের কমিটির পাশাপাশি বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। বিসিআইসির কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে একজন জেনারেল ম্যানেজারকে। কমিটিটি তদন্ত শেষ করে ঢাকায় ফিরে গেছে।


তিনি বলেন, কৃষকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তাই আগাম সার কেনার প্রয়োজন নেই। কোনো কৃষক নির্ধারিত ডিলারের কাছ থেকে চাহিদামতো সার না পেলে সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে পাশের ইউনিয়ন থেকে তাঁকে সার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।


কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় বিএডিসির আওতায় ১১৪ জন এবং বিসিআইসির আওতায় ৯৪ জন সার ডিলার রয়েছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে বিএডিসির তিনজন ও বিসিআইসির একজন ডিলার থাকার কথা। তবে বাস্তবে কোথাও কোথাও এ সংখ্যায় কমবেশি রয়েছে। ভবিষ্যতে সব ডিলারের মধ্যে সমন্বিতভাবে সমহারে ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার সরবরাহের কার্যক্রম চলছে।


জেলায় আগস্ট মাসে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ৫ হাজার ৮৭৫ মেট্রিক টন, যার বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। সেপ্টেম্বরে ইউরিয়ার চাহিদা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন। আমন মৌসুমে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময়সীমা শেষ হবে। ফলে জেলায় ইউরিয়া সারের ঘাটতি হবে না বলে দাবি কৃষি বিভাগের।


তবে কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় অনেক সময় সরবরাহ কম থাকে। আবার কিছু ডিলার নিয়মিত বিক্রয়কেন্দ্র খোলেন না। এতে প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে কৃষকদের খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।


কৃষি বিভাগের দাবি, উপজেলায় কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার মজুত রয়েছে। শিলখুড়িতে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে ডিলারের সংখ্যা ও ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দের মধ্যে অসামঞ্জস্যকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তাঁরা সার পাচ্ছেন না। বিশেষ করে শিলখুড়িতে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়লেও আগের কাঠামো অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।


এলাকাবাসী জানান, ভূরুঙ্গামারীর অনেক ডিলারের গুদাম নিজ ইউনিয়নের বাইরে অবস্থিত। শিলখুড়ি ইউনিয়নের সার ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তাইফুর রহমান মুকুলের গুদামও ইউনিয়নের বাইরে বলে জানা গেছে।


কৃষকদের অভিযোগ, ঘটনার দিন নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা না থাকায় কয়েক শ কৃষক সেখানে ভিড় করেন। মজুতের তুলনায় কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় একপর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান।


শিলখুড়ির উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে গেলেও সেটি খোলা পাননি। রোববার জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে সকাল ৮টায় লাইনে দাঁড়িয়েও সাড়ে ৯টার আগে ডিলার আসেননি। পরে সার সংকটের কথা বলে বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কৃষকেরা গুদাম থেকে সার নিয়ে যান।


ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুল আজিম বলেন, গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ডিলার তাইফুর রহমান মুকুল রোববার রাতে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। মঙ্গলবার পর্যন্ত ১২২ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।