দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সাবেক সেনাদের প্ল্যাটফর্ম, দেবাশীষ-গুলশান আরাকে গ্রেপ্তারের নেপথ্যে কী

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৫ এএম
দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সাবেক সেনাদের প্ল্যাটফর্ম, দেবাশীষ-গুলশান আরাকে গ্রেপ্তারের নেপথ্যে কী

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক


অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের পর দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তহবিল সংগ্রহ ও উসকানিমূলক প্রচারের অভিযোগ সামনে এনেছে পুলিশ। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।


এসব তৎপরতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল (৪৭) ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে (৪৩) গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাঁদের গ্রেপ্তার করে।


অভিযান-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য, পুলিশের করা মামলার এজাহার ও আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদন অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে মূলত সরকারবিরোধী প্রচার, অর্থায়ন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সংগঠিত তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।


গ্রেপ্তারের পর সোমবার বিকেলে তাঁদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে তৎপরতা চালানো এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পল্লবী থানায় করা মামলায় তাঁদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে।


দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে অভিযোগ


গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ এবং ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।


পুলিশের অভিযোগ, এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতেন।


এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের কথাও মামলার অভিযোগে উঠে এসেছে।


তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠিত তৎপরতা চালানো বলে পুলিশের অভিযোগ।


ফেসবুক পেজ ও অনলাইন প্রচার


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রচারও দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে গ্রেপ্তারের অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। পুলিশের রিমান্ড আবেদন অনুযায়ী, ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানি দেওয়ার মতো কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছিল।


এ ছাড়া কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগও আনা হয়েছে।


পুলিশের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার দুই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা সরকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।


২০১৮ সালের গণভবনের ঘটনা কেন সামনে


গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে ২০১৮ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, ওই বছরের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন কাজী গুলশান আরা।


অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ওই সফর এবং শেখ হাসিনার প্রতি তাঁদের সমর্থনের বিষয়টি সে সময় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল।


পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।


রিমান্ড আবেদনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।


আরও ১০১ জন আসামি, পাঁচ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ


পল্লবী থানায় করা মামলায় দেবাশীষ ও গুলশান আরা ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবর। এতে দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।


আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা কয়েকটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সহযোগী আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অন্যান্য ওয়েবসাইট ও পেজ শনাক্ত করা এবং মামলার মূল ঘটনা উদ্‌ঘাটন।


এ ছাড়া অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।


আদালতে অভিযোগ অস্বীকার


আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেন অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার আইনজীবীরা।


গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, একটি টক শোতে অংশ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন বলে তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু টক শোতে তিনি এমন কী বক্তব্য দিয়েছেন, যার কারণে দেশ অস্থিতিশীল হয়েছে, তা বলা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী তথ্য পাওয়া গেছে, রিমান্ড আবেদনেও তা উল্লেখ নেই বলে দাবি করেন তিনি।


দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করা হলেও কী কারণে এ অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাঁর অপরাধ কী, সে বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে কোনো ব্যাখ্যা নেই।


অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পতিত সরকারের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদেরও যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আদালতকে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।


এমকে/বিডিমেইল২৪