সম্পত্তির অধিকার রক্ষার আইন নিয়ে জামায়াতের সমালোচনার জবাব চিফ হুইপের
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, মা-বাবার সম্পত্তির অধিকার ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের বিরোধিতা করে শরিয়া আইনের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। অথচ ইসলামেও মা-বাবার প্রতি সম্মান ও তাদের সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, সরকার কোথাও বলেনি যে দেশে শরিয়া আইন চালু করা হবে। শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে যারা মা-বাবার অধিকার রক্ষায় প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করছেন, তাদের নিজেদের অবস্থানও পরিষ্কার করা উচিত।
তিনি বলেন, দেশের অনেক মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন। কেউ কেউ অসুস্থ মা-বাবাকে ঘরে আটকে রাখছেন, তাদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছেন কিংবা খোঁজখবর নিচ্ছেন না। জীবনের শেষ সময়ে মা-বাবার নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই আইন করে তারেক রহমানের কী লাভ হবে? এখানে ব্যক্তিগতভাবে কারও কী লাভ হবে? দেশের সাধারণ মানুষের মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো এই উদ্যোগ।’
শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফৌজদারি আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রচলিত রয়েছে। শরিয়া আইনে চুরির শাস্তি হিসেবে হাত কাটার বিধান থাকলেও বাংলাদেশে তা কার্যকর নয়। তাহলে প্রচলিত আইনের অধীনে আইন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরা কেন শরিয়া আইনের প্রসঙ্গ তুলে জনকল্যাণমূলক একটি আইনের বিরোধিতা করবেন—সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সরকার বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে আইনগুলোকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করেছে। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমনভাবে আইন করতে চাই, যাতে মানবাধিকার কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে একটি ভালো আইন করার চেষ্টা করেছি।’
এ সময় দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকট নিয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
সারের সংকট প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সার রয়েছে। তবে বিতরণ ব্যবস্থায় নানা সমস্যা রয়েছে। আগের সরকারের সময়ের প্রায় চার হাজার সার ডিলার ও বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছে সরকার।
বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব ব্যয় কমিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের নেওয়া ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। জনগণের করের টাকা যাতে অপচয় না হয়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর অবস্থানে রয়েছেন বলে দাবি করেন চিফ হুইপ। সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মন্ত্রী-এমপিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চের সমালোচনা করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, লংমার্চ করলেই যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবার আগে লংমার্চ করত। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সংকট সমাধান করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে দেখার নীতি সরকারের নেই। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার।
তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে যে কাজ করা প্রয়োজন, আমরা সেটিই আগে করব।’
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার সংসদকে কার্যকর রাখতে চায়। বিরোধী দলের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে তিনি জানান, ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের তিনজন করে রাখা হয়েছে। আইন ও বিচার, অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক, শ্রম, রেল, মহিলা ও শিশু এবং খাদ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। এর জন্য যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেখানে সংবিধান সংশোধন করেই তা করা হবে। আমরা চাই সবাই একসঙ্গে এসে সংবিধান সংশোধন করি।’
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণের বিষয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ১০১টি এমওইউ নিয়েই আলোচনা চলছে। দেশের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং যেখানে প্রয়োজন মনে হয়েছে, সেখানে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে না দাবি করে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বরং সংসদে দুই পক্ষের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিরোধিতা না করে জনস্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, সরকার দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।
এমকে/বিএম২৪








