কিশোরগঞ্জ গণপূর্তে ১৪ ঠিকাদারের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি ‘মনগড়া’

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
কিশোরগঞ্জ গণপূর্তে ১৪ ঠিকাদারের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি ‘মনগড়া’

সংগৃহীত

মোঃ মাহফুজুল হক, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি


সরকারি উন্নয়নকাজের দরপত্র, চুক্তি সম্পাদন ও বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে। একদিনে ২৭টি দরপত্রের চুক্তি সম্পাদন এবং পরদিনই বিলের চেক ইস্যুর অভিযোগসহ দরপত্র পদ্ধতি, নিরাপত্তা জামানত ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ১৪ জন ঠিকাদার। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।


অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী অভিযোগগুলোকে ‘মনগড়া ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে কয়েকজন ঠিকাদার তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।


অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দরপত্র আহ্বান, চুক্তি সম্পাদন, বিল অনুমোদন এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


২৭টি দরপত্র নিয়ে অভিযোগ, চুক্তি ও বিলের সময়রেখা যাচাইয়ের দাবি


অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুন কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদের ২৭টি ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) দরপত্র আহ্বান করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, ২২ জুন চুক্তিপত্র সম্পন্ন এবং ২৩ জুন সংশ্লিষ্ট কাজের বিলের চেক দেওয়া হয়। এসব কাজ পাঁচজন ঠিকাদার পেয়েছেন বলেও দাবি তাঁদের।


অভিযোগকারীদের এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র দাখিল ও মূল্যায়নের রেকর্ড, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, কাজের পরিমাপ বই এবং বিল অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চেক ইস্যুর তারিখ, অর্থ পরিশোধের ভিত্তি এবং কাজের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্যও যাচাই করা জরুরি।


একদিনে একাধিক চুক্তি সম্পাদন কিংবা পরদিন চেক ইস্যু হওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তবে অভিযোগে উল্লেখ করা সময়রেখা সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি ও আর্থিক অনুমোদন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


৩৫টি কাজের দরপত্র পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন


অভিযোগপত্রে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে অন্তত ৩৫টি কাজের দরপত্র পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাজের ক্ষেত্রে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের (এলটিএম) পরিবর্তে ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) অনুসরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি সংবাদপত্রে প্রকাশ না করা এবং সীমিতসংখ্যক ঠিকাদারের মধ্যে কাজ বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে।


তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিটি কাজের প্রাক্কলিত মূল্য, ক্রয়পরিকল্পনা, প্রযোজ্য ক্রয়পদ্ধতি, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নিয়ম, অনুমোদন ও দরপত্র মূল্যায়নের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ থেকেই বিধি লঙ্ঘনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।


সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংশ্লিষ্ট কাজগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।


প্রায় ৪৫ লাখ টাকার নয়টি চেক নিয়ে অভিযোগ


২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন কাজের বিল পরিশোধ, কথিত ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন, নিরাপত্তা জামানত ফেরত এবং ঈদুল আজহার আগে প্রায় ৪৫ লাখ টাকার নয়টি চেক ইস্যুর বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।


এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদ, মিঠামইন শিল্পকলা একাডেমি, আইনজীবী ভবন ও বিভিন্ন থানা ভবনের কাজ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি বাসভবন সংস্কার, সরকারি গাড়ির ব্যবহার, অফিসে উপস্থিতি এবং সরকারি কোয়ার্টার সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।


এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার, পরিমাপ বই, ব্যয়ের অনুমোদন, চেকের প্রাপক, আর্থিক লেনদেন, নিরাপত্তা জামানত ফেরতের হিসাব এবং সংস্কারকাজের অনুমোদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ ও লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই না করে সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।


নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন


নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর অভিযোগগুলোকে মনগড়া ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েকজন ঠিকাদার নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।


তিনি আরও দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।


তবে আগের তদন্তের প্রতিবেদন, তদন্তের পরিধি ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। পূর্ববর্তী তদন্তে বর্তমান অভিযোগগুলোর সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।


একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সমর্থনে কী ধরনের নথি রয়েছে, তা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো পক্ষের বক্তব্যকে আগাম চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে উভয় পক্ষের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।


নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি


কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে ২৭টি দরপত্রের চুক্তি ও বিলের সময়রেখা, ৩৫টি কাজের দরপত্র পদ্ধতি, প্রায় ৪৫ লাখ টাকার নয়টি চেক এবং নিরাপত্তা জামানতসংক্রান্ত হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।


অভিযোগকারীদের বক্তব্যের পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা ও উপস্থাপিত নথিও পর্যালোচনা করা উচিত। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া না গেলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো উচিত।


সরকারি অর্থের ব্যবহার ও উন্নয়নকাজের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জনস্বার্থের দাবি। তাই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিবর্তে নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণের দাবি উঠেছে।


এমকে/বিএম২৪