অংশীদারি চুক্তিতে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ হলে ফৌজদারি মামলা চলতে বাধা নেই: হাইকোর্ট

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৭ পিএম
অংশীদারি চুক্তিতে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ হলে ফৌজদারি মামলা চলতে বাধা নেই: হাইকোর্ট

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক



ব্যবসায়িক লেনদেন বা অংশীদারি চুক্তির সুযোগ নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সেটিকে শুধু ‘দেওয়ানি বিরোধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি বিচার কার্যক্রমও স্বাধীনভাবে চলতে পারে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।


‘মো. শাহ আলম বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় দেওয়া রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন উচ্চ আদালত। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়েরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়ের লিখেছেন। গত ২০ আগস্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।


মামলার নথি অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর রোডের গাউছিয়া মার্কেটের একটি দোকানের মালিক শাহ আলম। অংশীদারি লভ্যাংশ দেওয়ার শর্তে ওই দোকানে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন মো. জাহিদ খান। পরে ২০১২ সালে দোকানটি ১ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যে জাহিদ খানের কাছে বিক্রির জন্য সমঝোতা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে জাহিদ খান ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।


অভিযোগে বলা হয়, পরবর্তীতে দোকান রেজিস্ট্রি করে দিতে শাহ আলম টালবাহানা শুরু করেন। বিষয়টি দোকান মালিক সমিতিতে সালিশে গেলে জাহিদ খানের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। তবে শাহ আলম সম্পূর্ণ টাকা পাওয়ার বিষয়টি এবং চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। পাশাপাশি জাহিদ খানকে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগও আনা হয়।


এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে ঢাকার সিএমএম আদালতে দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় শাহ আলমের বিরুদ্ধে সি.আর. মামলা করেন জাহিদ খান। প্রাথমিক তদন্ত ও শুনানি শেষে একই বছর শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ঢাকার একজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।


পরে অভিযোগ গঠন ও মামলা বাতিল চেয়ে ২০২৪ সালে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন শাহ আলম। তাঁর দাবি ছিল, ব্যবসায়িক হিসাব বা অংশীদারি চুক্তি ভঙ্গের বিষয়টি মূলত দেওয়ানি বিরোধ। তাই এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনে বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণার অভিযোগে বিচার চলতে পারে না।


আবেদনটির শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট অধস্তন আদালতের আদেশ স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরে চূড়ান্ত শুনানিতে জাহিদ খানের পক্ষে আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ যুক্তি দেন, চুক্তির শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে অর্থ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে তা আত্মসাৎ করা হলে তা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। দেওয়ানি আদালতে প্রতিকারের সুযোগ থাকলেও একই ঘটনায় ফৌজদারি বিচার চলতে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে তিনি আপিল বিভাগের বিভিন্ন নজির তুলে ধরেন।


রায়ে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলের আবেদন বিবেচনার সময় মূলত নালিশি দরখাস্তে করা অভিযোগগুলোই বিবেচনা করতে হয়। এ মামলায় অংশীদারি চুক্তির শুরু থেকেই প্রতারণামূলক উদ্দেশ্য এবং অর্থ আত্মসাতের নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিষয়টিকে শুধু দেওয়ানি বিরোধ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


আদালত আরও বলেন, আসামি প্রকৃতপক্ষে দোকানের মালিক ছিলেন কি না কিংবা তিনি অর্থ পেয়েছেন কি না—এসব বিষয় বিতর্কিত। তাই সাক্ষ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে বিচারিক আদালতেই এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হতে হবে। এ পর্যায়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।


হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, নালিশি দরখাস্তে আসামির শুরু থেকেই প্রতারণামূলক অভিপ্রায় এবং পরবর্তীতে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। তাই দেওয়ানি বিরোধের অজুহাতে ফৌজদারি মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা যাবে না।


এ কারণে শাহ আলমের করা রুল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়। অধস্তন আদালতে চলমান মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত এবং আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


মামলায় হাইকোর্টে আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী আবুল কাশেম এবং জাহিদ খানের পক্ষে আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সালমা সুলতানা ও নজরুল ইসলাম ছোটন।



এমকে/বিএম২৪