লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ
ছবি: সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ওরফে রনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেড় কোটি পাউন্ড মূল্যের একটি ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন দেশটির হাইকোর্ট। অর্থ পাচারের সন্দেহে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে এ আদেশ দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লন্ডনের রিজেন্টস পার্ক এলাকার ফ্ল্যাটটি ২০২৩ সালে কেনা হয়। এর ক্রয়মূল্য ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে সম্পত্তিটির মূল্য বেড়ে প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) ফ্ল্যাটটির মালিকানা ও কেনার অর্থের উৎস নিয়ে তদন্ত করছে। সংস্থাটির অভিযোগ, সম্পত্তিটির প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে জটিল মালিকানা কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। ফ্ল্যাটটি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি এর প্রকৃত মালিক বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
আদালতে এনসিএর পক্ষ থেকে বলা হয়, ফ্ল্যাটটির সঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের সন্দেহজনক সম্পর্ক রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পত্তিটি বিক্রি বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর ঠেকাতে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্ল্যাটটির মালিকানা-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার মাত্র এক পাউন্ডের বিনিময়ে তৃতীয় একটি পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এনসিএর দাবি, আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। পরে সম্পত্তিটির মালিকানা তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলেও অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
বিচারপতি কারেন স্টেইন মনে করেন, ফ্ল্যাটটি অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে কেনা হয়ে থাকতে পারে—এমন দাবি করার যথেষ্ট যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। এ কারণে সম্পত্তিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে সম্পত্তির দখল ফিরে পেতে বাড়িওয়ালার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আদালতে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবীরা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেননি। তবে আনিসুজ্জামান দাবি করেছেন, তিনি কোনো বেআইনি কাজ করেননি এবং সম্পত্তির মালিকানা গোপন করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। ভবিষ্যতে সম্পদ বাজেয়াপ্তের জন্য দেওয়ানি মামলা হলে তিনি তা জোরালোভাবে মোকাবিলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
সাবেক ভূমিমন্ত্রীর সম্পদ নিয়েও তদন্ত
এনসিএর বৃহত্তর তদন্তের আওতায় রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ২০২৫ সালের জুনে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড মূল্যের সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর, তাঁর স্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে আদালতের আদেশ নেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্যে এ ধরনের আদেশকে বলা হয় ‘আনএক্সপ্লেইনড ওয়েলথ অর্ডার’ বা ইউডব্লিউও। এ আদেশের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পদের অর্থের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্বজনেরা ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তির মালিক হন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ভূমি নিবন্ধন দপ্তরের নথি অনুযায়ী, আনিসুজ্জামান চৌধুরী ২০২৩ সালে ‘রনি ৪২ লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কেনেন। পরে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে ‘পিএনএন ইউকে প্রপার্টিজ’ রাখা হয়।
এনসিএর আইনজীবীরা আদালতে আরও জানান, সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিবিএস ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পুনঃঅর্থায়নের উদ্যোগের সঙ্গে কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের সম্পর্ক ছিল। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে ডিবিএস ব্যাংকও ফ্ল্যাটটির দখল নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে।








