পশ্চিমাদের নজরে এনসিপি কেন?

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
পশ্চিমাদের নজরে এনসিপি কেন?

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল গঠনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এনসিপিকে ঘিরে আগ্রহ দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দলটির নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক ও মতবিনিময় সেই আগ্রহেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এনসিপির প্রতি বিদেশি কূটনীতিকদের যে মনোযোগ তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে দলটি সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন, সুশাসন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে এনসিপির যোগাযোগও বাড়ছে।


এনসিপির আন্তর্জাতিক সেলের ইনচার্জ আলাউদ্দিন মোহাম্মদ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছাত্রনেতৃত্ব ছিল পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সে কারণে বিএনপি-জামায়াতের পাশাপাশি ছাত্রনেতৃত্বকেও বিদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার হিসেবে বিবেচনা করেছিল। বর্তমানে এনসিপি একটি সংসদীয় রাজনৈতিক দল হওয়ায় দলটির প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ স্বাভাবিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


এনসিপির নেতাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেছেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।


সর্বশেষ ১২ আগস্ট এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি প্রতিনিধিদল দলটির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করে। এর আগে ৬ আগস্ট ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন।


গত ২২ জুলাই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন ও ইইউর প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন সময়ে এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।


এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের দাবি, নির্বাচনে ইতিবাচক ফলাফলের পর আন্তর্জাতিক মহলে দলটির প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশিরা এনসিপিকে কোনো জোটের অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করছে। তরুণ নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক চিন্তা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পরিকল্পনাই দলটির প্রতি বাড়তি আগ্রহের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।


দলের যুগ্ম-সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশিরও মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে এনসিপির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বেড়েছে। তার মতে, আগে দলটির নেতারা মূলত গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এখন তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তরুণ নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বিদেশিদের আগ্রহের অন্যতম কারণ।


তবে এনসিপির প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর এই বাড়তি মনোযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত বাস্তবতায় এনসিপিকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। আবার কেউ কেউ এর পেছনে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির প্রভাব রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা করছেন।


এনসিপির পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশের বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও রেমিট্যান্স-সম্পর্ক রয়েছে, তারা সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। দলটির দাবি, বিদেশিরা এনসিপিকে জামায়াতের কোনো অংশ হিসেবে নয়, বরং স্বতন্ত্র ও পৃথক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই মূল্যায়ন করছে।


এনসিপির নেতাদের মতে, গণতন্ত্র সংহত করা, মানবাধিকার রক্ষা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে দলটির অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। অন্যদিকে কূটনৈতিক মহলের প্রত্যাশা— এনসিপি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হবে।


সব মিলিয়ে, গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণ নেতৃত্ব, সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব, রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনসিপির অবস্থান— এসব কারণেই দলটির প্রতি পশ্চিমা কূটনীতিকদের আগ্রহ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


সূত্র: ঢাকা পোস্ট


এমকে/বিএম২৪