দিনে আয় ৪০০ টাকা, তিন প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে দিশেহারা বাবা

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০০ পিএম
দিনে আয় ৪০০ টাকা, তিন প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে দিশেহারা বাবা

সংগৃহীত

মোঃ শরীফ উদ্দিন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি


অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন স্বাধীন সূত্রধর। এই সামান্য আয়ে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। তার ওপর তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে ঘরের বাইরে কাজ করার সুযোগ নেই স্ত্রী শ্রীমতী সূত্রধরেরও। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটির জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুই সন্তান প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সৃষ্টি সূত্রধর এখনো ভাতা পাচ্ছে না। তবে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়।


সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার চাকুয়া গ্রামের বাসিন্দা স্বাধীন সূত্রধর। তাঁর তিন সন্তান সনজীব সূত্রধর (১৮), সৃষ্টি সূত্রধর (১৫) ও সমাপ্ত সূত্রধর (১২)। তিনজনই প্রতিবন্ধী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বাধীন। প্রতিদিন অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হয় তাঁকে।


সন্তানদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা করতে হয় বলে স্ত্রী শ্রীমতী সূত্রধরের পক্ষে বাইরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি তিন সন্তানের প্রয়োজনীয় যত্ন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাধীন।


স্বাধীন সূত্রধর বলেন, “আমি মানুষের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই। সেই টাকায় টেনেটুনে সংসার চালাতে হয়। আমার বড় ছেলের বয়স এখন ১৮ বছর। সে সুস্থ থাকলে হয়তো সংসারের হাল ধরতে পারত। আমার সন্তানদের দেখাশোনা করে স্ত্রী। তাদের রেখে সে কোনো কাজ করতে পারে না।”


তিনি আরও বলেন, “আমার বড় ছেলে ও ছোট মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। কিন্তু মেজো মেয়েটা এখনো ভাতা পায়নি। গত এক বছর ধরে শাল্লা সমাজসেবা কার্যালয়ে ভাতার জন্য আবেদন করছি। কেন ভাতা হয়নি, তা জানি না। সরকারের সব পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা পেলে খেয়েপরে বাঁচতে পারব।”


তিন সন্তানকে আগলে রাখাই মা শ্রীমতী সূত্রধরের প্রতিদিনের কাজ। সন্তানদের পরিচর্যার কারণে তাঁর পক্ষে বাইরে গিয়ে আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। সংসারে বাড়তি আয়ের সুযোগ না থাকায় আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।


শ্রীমতী সূত্রধর বলেন, “আমার সারাদিন যায় সন্তানদের দেখাশোনায়। তাদের রেখে বাইরে গিয়ে সংসারের জন্য কোনো কাজ করতে পারি না। সরকারের কাছে আমাদের একটাই চাওয়া—তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিলে হয়তো আমরা বাঁচতে পারব।”


পরিবারটির প্রতিবেশী রঞ্জন সূত্রধরও তাদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, স্বাধীন সারাদিন অন্যের বাড়িতে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন, আর তাঁর স্ত্রী তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের দেখাশোনা করেন। পরিবারটির চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।


স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য সুনীল চন্দ্র দাস জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পরিবারের দুই সন্তানকে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আনতে সহযোগিতা করেছেন তিনি। সৃষ্টির জন্যও আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো ভাতা চালু হয়নি। এ বিষয়ে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। পরিবারটি যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পায়, সে জন্য নিজের সাধ্যমতো সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান তিনি।


শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বপতি চক্রবর্তী বলেন, “পরিবারটির বিষয়ে আমি অবগত আছি। দুই সন্তানের প্রতিবন্ধী ভাতা হয়েছে। আরেকজনের বিকাশ পেমেন্ট নম্বর দিলে ডিসেম্বরের মধ্যে ভাতা পাবে। চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় উপকরণ সুনামগঞ্জ জেলা অফিস থেকে দেওয়া হয়। তারপরও সব ধরনের সরকারি সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করব।”


শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তবে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরপরও পরিবারটির জন্য কিছু করা যায় কি না, তা দেখবেন বলে জানান তিনি।


এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বলেন, “আমি পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। বিকাশ পেমেন্ট নম্বর দিলে খুব দ্রুত ভাতা পাবে। আপাতত আমাদের কার্যালয় থেকে তিনটি হুইলচেয়ার দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে তাদের চিকিৎসাসহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”


জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এ আশ্বাস পরিবারটির মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। সৃষ্টির প্রতিবন্ধী ভাতা চালুর পাশাপাশি তিন সন্তানের চলাচলের সুবিধার্থে তিনটি হুইলচেয়ার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।


দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে তিন প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা স্বাধীন সূত্রধরের একার পক্ষে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবারটির প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দেওয়া আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং তারা প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাবে।


এমকে/বিএম২৪