বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট কাটাতে সময় লাগবে: অর্থমন্ত্রী
সূত্রঃ সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট এক দিনে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি বর্তমান সরকারের তৈরি সমস্যা নয়; আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া একটি ‘ইনহেরিটেড’ বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট। তবে সরকার বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সম্পদ কাজে লাগাচ্ছে। ধীরে ধীরে এ সংকটের উন্নতি হবে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন খাতে মজুতের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ দিন বা ১৭ দিনের মজুতও ছিল না। এখন তা এক মাসে নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে তিন মাসের মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কারণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সমাধানে সময় লাগবে। সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টা এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ কাজে লাগানো হলেও সবকিছু সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই শিল্প খাতকে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। বিদ্যুৎ-গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তবে তা ধীরে ধীরে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়ছে। এর প্রভাব খেলাপি ঋণের ওপরও পড়ার বাস্তবতা রয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ডসহ একটি প্যাকেজ দিয়েছে। যারা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চান, তাদের জন্যও নীতিগত সুযোগ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকারদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা দরকার। কোনো ঋণ হয়তো ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে থাকবে, কিন্তু বাস্তবে যদি সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে শুধু কাগজে ঋণ দেখিয়ে রাখার কোনো অর্থ নেই। ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করা এবং প্রকৃত তারল্য তৈরি করা প্রয়োজন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজ আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। যাঁরা এই প্যাকেজের আওতায় যোগ্য, কিন্তু কোনো ব্যাংকে গিয়ে বাধার মুখে পড়বেন, তাঁদের বিষয়টি সরকারকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তবে অতীতে এ ধরনের অর্থায়নে অনিয়ম ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এবার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ রাখা হবে না। আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগও দেওয়া হবে না। ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরই ঋণ দিতে হবে।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতকে বাজারের নিয়মে চলতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
সেমিনারে সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আগের বাস্তব আদায়ের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তাঁর প্রশ্ন, এত বড় প্রবৃদ্ধি আদৌ বাস্তবসম্মত কি না।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব বেশ কিছু প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে এসব উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। একদিকে সরকার রাজস্ব ও আর্থিক নীতির মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে উচ্চ সুদহার ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশের মতো হওয়ায় বিনিয়োগে বড় বাধা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যবসার মোট খরচের বড় অংশ শুধু মূলধনের খরচ নয়। লজিস্টিকস ও অন্যান্য ব্যয়ও ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। তাই শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি নতুন করে ভাবতে হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এডিপির আকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা হলেও গত অর্থবছরে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এটি ছিল শতাংশের হিসাবে সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের অন্যতম উদাহরণ। ফলে ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে বড় ধরনের সক্ষমতার পরিবর্তন আনতে হবে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর এডিপি বাস্তবায়নে ‘শেষ প্রান্তিকের প্রবণতা’ দেখা যায়। প্রথম তিন প্রান্তিকে যে পরিমাণ কাজ হয় না, শেষ প্রান্তিকে তার বড় অংশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এতে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল ও অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থাকে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কিউআর কোডের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। জনগণ যে পরিমাণ ভ্যাট দেয়, তার একটি বড় অংশ যেন সরকারি কোষাগারে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি বেসরকারি খাত। সরকারের কাজ হওয়া উচিত ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সঠিক নীতিকাঠামো তৈরি করা।
তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের সামনে বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি সময় নেই। তাই এখন আর পরিস্থিতি এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে—এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বললেও বাস্তবে তৈরি পোশাকের বাইরে বড় কোনো খাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যেতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উচ্চ ও জটিল শুল্ক কাঠামো এবং আমদানি ব্যবস্থার অতিরিক্ত সুরক্ষাকে দায়ী করেন তিনি।
ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশে সুরক্ষিত বাজার থাকায় অনেক উদ্যোক্তার জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করা রফতানির চেয়ে বেশি লাভজনক। ফলে নন-গার্মেন্টস রফতানি বাড়াতে হলে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করতে হবে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগে এমন অনেক বাধা রয়েছে, যেগুলো সরাসরি সরকারি রাজস্বে যায় না, কিন্তু অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা তৈরি করে। তিনি এটিকে ‘হয়রানি কর’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন অনুমোদন, সার্টিফিকেশন ও সরকারি দপ্তরের কাজে অতিরিক্ত সময় লাগার কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর সময়ের বড় ব্যয় চাপছে। এই ‘হয়রানি কর’ কমাতে এক বছরও লাগার কথা নয়, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে এখন শুধু ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা রেজিলিয়েন্সের কথা বললে হবে না; অর্থনীতিতে গতি বা ‘স্পিড’ আনতে হবে। দেশের প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও দ্রুত সংস্কার ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কর্মসংস্থান শুধু সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে তৈরি করার বিষয় নয়। অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব খেলাপি ঋণ ইচ্ছাকৃত খেলাপির কারণে তৈরি হয়নি। ব্যবসা পরিচালনায় দীর্ঘদিন অনুমোদন না পাওয়া, পরিবেশগত বা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়েছে। তাই খেলাপি ঋণের কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিকেএসএফের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে সংস্কার বাস্তবায়নে নির্বাহী ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ‘ইকোনমিক রিফর্ম অ্যাক্সিলারেটর ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির সমস্যার সমাধান শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় বা সরকার একা করতে পারবে না। বেসরকারি খাতসহ সব পক্ষকে নিয়ে অংশীদারত্ব ও দলগতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করাও কঠিন হবে। বাংলাদেশের অতীতের প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগনির্ভর ছিল। ভবিষ্যতেও বেসরকারি খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডিরেগুলেশনকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে এ বিষয়ে কমিটি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা কোথাও সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়লে তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইটও করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, শুধু অভিযোগ করলেই হবে না, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও বাধার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। কাস্টমস, বন্দর ও বেসরকারি খাতকে নিয়ে বসে পণ্য খালাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন কাজ কতদিনের মধ্যে করতে হবে, সেটিও সময়বদ্ধ করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের দেওয়া কোনো সিদ্ধান্তই খোলা সময়সীমার মধ্যে থাকবে না। প্রতিটি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।
সেমিনারে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানসহ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে রাজস্ব আদায়, মুদ্রানীতি, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাত, এলডিসি উত্তরণ, রফতানি বহুমুখীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বেসরকারি খাতের বাধা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এমকে/বিএম২৪









