হামের ভয়াল থাবা: এক মাসে ৩৭ শিশুর মৃত্যু, ৭৩% ছিল টিকাবঞ্চিত—দায় কার?
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী ব্যুরো:
রাজশাহী অঞ্চলে হামের সংক্রমণে গত মার্চ মাসে অন্তত ৩৭ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। এর মধ্যে ২৭ জনই ছিল টিকাবঞ্চিত—যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশ। বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাই নয়, বরং টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা, তদারকি এবং জনসচেতনতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ২৩ জন ছেলে ও ১৪ জন মেয়ে। এদের মধ্যে মাত্র ১০ জন টিকা পেয়েছিল, বাকি ২৭ জন কোনো টিকা নেয়নি। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি, যাদের টিকা দেওয়ার নির্ধারিত সময় এখনো শুরু হয়নি—ফলে তারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা তুলনামূলক কম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ১৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৭ জন, পবা উপজেলায় ৪ জন এবং কুষ্টিয়া, পাবনা, নওগাঁসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা অপুষ্টি, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। টিকা গ্রহণের পরও কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলেও অধিকাংশ মৃত্যুর পেছনে টিকাবঞ্চিত থাকা প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, “৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া যায় না, তাই তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে বড় শিশুদের ক্ষেত্রে টিকা না নেওয়াই মৃত্যুর অন্যতম কারণ।”
এদিকে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম বলেন, “টিকার কোনো ঘাটতি নেই। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা আগামী ১০ মে পর্যন্ত চলবে। মহানগরীতে প্রায় ৫৪ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।”
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অনেক অভিভাবক এখনও টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করেন, আবার দুর্গম এলাকার কারণে অনেক শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত ফলোআপের অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকাদান কর্মসূচি চালু থাকলেই হবে না—তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। অন্যথায়, এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশু মৃত্যুর হার কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, রাজশাহীতে হামের এই ভয়াবহ চিত্র একটি সতর্কবার্তা—যা অবহেলা করলে ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।








