কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে? স্থান নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক
ছবি: বিডি মেইল
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে জেলাজুড়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত নালিয়ার দোলা এলাকায় ক্যাম্পাস নির্মাণের পক্ষে রয়েছেন এক পক্ষ। অন্যদিকে, সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের দাশেরহাটের ছড়া ও ধরলা নদীর পূর্ব প্রান্তে ক্যাম্পাস স্থাপনের দাবিও উঠেছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান চূড়ান্ত করতে প্রস্তাবিত এলাকাগুলো পুনরায় পরিদর্শন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে এখনো চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণের ঘোষণা আসেনি।
স্থান নির্বাচন নিয়ে মতভেদ দেখা দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের অগ্রগতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় স্থান নির্ধারণ করে নির্মাণকাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন।
নালিয়ার দোলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রাম শহরের দক্ষিণে কুড়িগ্রাম-চিলমারী মহাসড়কের পাশে নালিয়ার দোলা এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য স্থান নির্ধারণ করে ইউজিসি। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ওই স্থানে জমি বরাদ্দের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পূর্বনির্ধারিত স্থানে ক্যাম্পাস নির্মাণ নিয়ে নতুন করে মতভেদ দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিকল্প স্থান নির্বাচনের দাবিও সামনে আসে। এর মধ্যে সদর উপজেলার দাশেরহাটের ছড়া ও ধরলা নদীর পূর্ব প্রান্তের নাম আলোচনায় আসে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচন নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনটি সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন
গত ২৭ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ নিয়ে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহ. রাশেদুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভা শেষে ইউজিসির পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নালিয়ার দোলা ও দাশেরহাটের ছড়া এলাকা পরিদর্শন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য প্রস্তাবিত স্থানগুলো যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবে এ পরিদর্শন করা হয়।
ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জানান, আগের সরকারের নেওয়া বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের আগে পুনরায় যাচাই করার নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের সম্ভাব্য স্থানগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোন স্থান বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য বেশি উপযোগী, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না। এ বছরই স্থান নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা থাকবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থান নির্বাচন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এক পক্ষ নালিয়ার দোলায় পূর্বনির্ধারিত স্থানেই ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবি জানাচ্ছে। অন্য পক্ষ বিকল্প স্থানে ক্যাম্পাস স্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
গত ৩ আগস্ট নালিয়ার দোলায় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিতে কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের আমিন বাজার এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পূর্বনির্ধারিত স্থানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে, বিকল্প স্থান নিয়ে আলোচনা ও দাবি অব্যাহত রয়েছে। ফলে স্থান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো এলাকার প্রতি পক্ষপাত না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন, জমির প্রাপ্যতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবেশগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
স্থান নির্বাচনে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমির পাশাপাশি গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ থাকা জরুরি। বিশেষ করে কৃষি গবেষণা, পরীক্ষামূলক খামার, গবেষণাগার, শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং ভবিষ্যতে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
ইউজিসির সমন্বয় সভায় জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে খাসজমিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, কৃষিজমি সুরক্ষা, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এসব মানদণ্ড অনুসরণ করে সম্ভাব্য স্থানগুলোর তুলনামূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বিতর্ক কমার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাও বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবি
কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উত্তরাঞ্চলে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করা। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত গবেষণার নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণার পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস কোথায় নির্মিত হবে, সে বিষয়ে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে স্থান নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করা এবং জেলার বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচন এখন জেলার অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নালিয়ার দোলা, দাশেরহাটের ছড়া নাকি অন্য কোনো প্রস্তাবিত স্থান—শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ে উঠবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস, তা নির্ভর করছে ইউজিসির যাচাই-বাছাই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।









