প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গাদের একমাত্র সমাধান

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪১ এএম
প্রত্যাবাসনই রোহিঙ্গাদের একমাত্র সমাধান

সূত্রঃ সংগৃহীত

কক্সবাজার প্রতিনিধি


২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। দীর্ঘ আট দিন দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আশ্রয় নেন উখিয়ার কুতুপালংয়ে। নয় বছর পরও সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাকে কাঁদায়। তবে নিজের দেশ ও ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো তার মনে প্রবল।


জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত নতুন করে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।


২০২৩ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত এখনো অব্যাহত রয়েছে। রাখাইনের চলমান অস্থিরতার মধ্যেও রোহিঙ্গাদের বড় অংশ নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী। তাদের মতামত ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।


২০২৫ সালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে ইউসিআরের প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইমাম, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী প্রতিনিধি, হেড মাঝি, প্রবীণ নাগরিক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, যুবক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মীসহ ১৪টি শ্রেণি থেকে প্রতিনিধিদের বাছাই করা হয়।


বর্তমানে ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গাদের একটি সমন্বিত নেতৃত্বের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে ইউসিআর। সংগঠনটির সদস্যরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, ক্যাম্পে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে তারা কাজ করছেন।


ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে জীবন রক্ষা করেছে, এজন্য তারা কৃতজ্ঞ। আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলোও সহযোগিতা করছে। তবে তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না। নিজ দেশে ফিরে যাওয়াকেই রোহিঙ্গাদের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।


রোহিঙ্গা তরুণ মোহাম্মদ ফুরকান মির্জার ভাষ্য, ইউসিআর দেখিয়েছে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে নিজেদের সংগঠিত করতে পারে। তার মতে, সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের ঐক্য, জবাবদিহিতা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠেছে।


রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই চান, রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যাক।


স্থানীয় আইনজীবী ব্যারিস্টার সাফফাত ফারদিন চৌধুরী বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের অবস্থানের কারণে স্থানীয়দের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তাই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির দাবি জানান তিনি।


কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ১২ লাখের বেশি মানুষকে ধাপে ধাপে ফেরত পাঠানো দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। শুধু সীমান্ত পার করে দিলেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হবে না। নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।


এদিকে রাখাইনে সংঘাত পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের পথকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ২৭১ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে আরাকান আর্মি। একই সঙ্গে জান্তা বাহিনীও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে রাখাইনে সংঘাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে।


ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা চলমান সংঘাতের কারণে এখনো তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রথমে সংঘাত বন্ধ করতে হবে। এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি ও বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।


তার মতে, এসব শর্ত তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় শরণার্থী নীতিমালা বা কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।


শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সংকট সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।


আগামীকাল ২৫ আগস্ট নবমবারের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবিই রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




এমকে/বিএম২৪