শৈশবের আশ্রয়েই শারমিনের বিয়ে, আনন্দে ভাসল শিশু পরিবার

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৪ পিএম
শৈশবের আশ্রয়েই শারমিনের বিয়ে, আনন্দে ভাসল শিশু পরিবার

সংগৃহীত

মোঃ শরীফ উদ্দিন, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি


একদিন পথ হারিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে সুনামগঞ্জের ছাতকে চলে এসেছিল ছোট্ট শারমিন আক্তার। চেনা ছিল না ঠিকানা, জানা ছিল না কোথায় তাঁর আপনজন। অনিশ্চয়তার সেই দিনগুলোতে আশ্রয় হয়েছিল সরকারি শিশু পরিবার। সেখানেই কেটেছে জীবনের প্রায় ১২টি বছর। সেই প্রতিষ্ঠানের স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা শারমিন এবার শুরু করেছেন নতুন জীবন। তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের আঙিনায়, যে প্রতিষ্ঠান একসময় তাঁকে দিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়।


শারমিনের বিয়েকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শিশু পরিবার। আয়োজনে যোগ দেন জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা। তাঁদের দোয়া, শুভকামনা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন নবদম্পতি। শিশু পরিবারের বর্তমান বাসিন্দাদের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক বাসিন্দারাও। সবার অংশগ্রহণে আয়োজনটি পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়।


শারমিনের জন্ম ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ। তাঁর বাবার নাম জাকির মিয়া এবং মায়ের নাম হাছিনা বেগম। প্রায় ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালে ছাতক থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) সূত্র ধরে তাঁর বাবা-মায়ের নাম জানতে পারে সরকারি শিশু পরিবার কর্তৃপক্ষ। এর আগে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চড়ে পথ হারিয়ে ছাতকে চলে এসেছিল শিশুটি।


ছাতক থানা পুলিশ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রথমে সিলেটের একটি সেইফ হোমে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষ তাঁকে শিশু পরিবারে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সে সময় সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে কোনো আসন খালি না থাকায় ২০১৫ সালের ১৬ মার্চ তাঁকে শ্রীমঙ্গল সরকারি শিশু পরিবারে পাঠানো হয়।


সেখানে প্রায় দুই বছর থাকার পর আসন খালি হলে শারমিনকে সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারে নিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে এই প্রতিষ্ঠানেই কাটে তাঁর শৈশব ও কৈশোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়। শিশু পরিবারের পাশের বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। একসময় যে প্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর নিরাপদ আশ্রয়, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর আপন ঠিকানা।


বর্তমানে ১৯ বছর বয়সী শারমিন এবার নিজের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছেন। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পশ্চিম নিয়ামতপুর গ্রামের ইয়াকুব আলী ও নাছিমা আক্তারের ছেলে মুজাহিদুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় থেকে গড়ে ওঠে তাঁদের সম্পর্ক। ২১ বছর বয়সী মুজাহিদুল সুনামগঞ্জ শহরে ছোটখাটো ব্যবসা করেন। সেই সম্পর্কের পরিণতিতেই তাঁদের বিয়ের আয়োজন করা হয়।


শারমিনের বিয়েকে ঘিরে শিশু পরিবারের বাসিন্দাদের মধ্যে ছিল বাড়তি উচ্ছ্বাস। সবার কাছে আয়োজনটি ছিল পরিবারেরই একজন মেয়ের বিয়ের মতো। প্রতিষ্ঠানটিতে থাকা ৫৭ জন শিশু-কিশোরীর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে যোগ দেন সাবেক বাসিন্দারাও। তাঁদের অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য এখন প্রতিষ্ঠানটির বাইরে রয়েছেন। দীর্ঘদিনের স্মৃতি ও পারস্পরিক ভালোবাসার টানে তাঁদের উপস্থিতি বিয়ের আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।


সুনামগঞ্জ সরকারি শিশু পরিবারের ইতিহাসে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন এবারই প্রথম। ফলে শারমিনের বিয়ে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নতুন অধ্যায় নয়, প্রতিষ্ঠানটির জন্যও হয়ে উঠেছে স্মরণীয় ঘটনা।


বিয়ে উপলক্ষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, “আমাদের শিশু পরিবারের শারমিনের সঙ্গে মুজাহিদুল ইসলামের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা), জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অফিস এবং সংসদ সদস্যসহ সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হওয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত, গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি। এমন একটি মহৎ কাজে উপস্থিত থাকতে পেরে সত্যিই আনন্দিত।”


নবদম্পতির জন্য দোয়া করে জেলা প্রশাসক বলেন, তাঁরা যেন সুখে ও শান্তিতে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারেন। পাশাপাশি এই আয়োজনের পেছনে যাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।


একদিন যে মেয়েটি পথ হারিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছাতকে এসেছিল, আজ সেই মেয়েটিই পা রেখেছেন নতুন জীবনে। পেছনে রয়ে গেছে সরকারি শিশু পরিবারের স্নেহ-মমতায় ঘেরা শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি। সামনে নতুন সংসার, নতুন দায়িত্ব আর নতুন স্বপ্ন।


শারমিনের এই বিয়ে যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, আপন হয়ে ওঠার জন্য শুধু রক্তের সম্পর্কই যথেষ্ট নয়। ভালোবাসা, মমতা ও সহযোগিতার বন্ধনেও গড়ে উঠতে পারে একটি পরিবার। আর সেই পরিবারের ছায়াতেই একদিন আশ্রয় পাওয়া একটি মেয়ের জীবনে খুলে যেতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।


এমকে/বিএম২৪