দুর্নীতি, সার সংকট ও প্রধান বিচারপতি ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ
সূত্রঃ বিডি মেইল
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতি, সার সংকট, জ্বালানি-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল জাতীয় সংসদ। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) অধিবেশনে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, মাঠপর্যায়ে সারের সংকট, ডিলার নিয়োগ, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরব ছিলেন সংসদ সদস্যরা।
বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হওয়া অধিবেশনের প্রথম অংশে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং দ্বিতীয় অংশে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, বিগত সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। কয়েকটি প্রকল্পের তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ার পেছনে শুধু একটি কারণ দায়ী নয়। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মিলেই অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ প্রবণতা ঠেকাতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং অনুমোদনের পর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন এবং বড় পরিসরে ২ডি ও ৩ডি সাইসমিক জরিপ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একটি সার কারখানা ও ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে সংসদে সার সংকট নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। সংকটের কারণে কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও কালোবাজারির অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, বিভিন্ন কারণে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯টি সার ডিলার পয়েন্ট শূন্য রয়েছে। এসব পদে নতুন ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, সরকারের গুদামগুলোতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিসহ প্রয়োজনীয় সারের মজুত রয়েছে। সার নিয়ে অনিয়ম ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং জরিমানার কথাও জানান তিনি।
সারের কৃত্রিম সংকট ও ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সংসদ সদস্যরা কঠোর নজরদারি ও সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থার দাবি জানান। সীমান্ত দিয়ে ভর্তুকির সার পাচারের আশঙ্কার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়। বিএনপি সরকারের আমলে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সার সংকট এবং ঋণখেলাপি পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করলে সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য হৈচৈ শুরু করেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাঁকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রত্যেক সদস্যের নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের অধিকার রয়েছে এবং অন্যদের উচিত বক্তব্যে বাধা না দিয়ে প্রয়োজন হলে পরে তার জবাব দেওয়া।
প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে আলোচনা
প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনাও সংসদে আলোচনায় আসে। পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে জনমনে কী বার্তা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। তবে এটিকে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ক্ষমতার পৃথকীকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হলেও বার অ্যাসোসিয়েশন রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ নয়। বার ও বেঞ্চের মধ্যে মতবিরোধ বা উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলার নজির রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবিধান ও নামাজ নিয়ে বিতর্ক
সংবিধানে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান ও আস্থা পুনঃস্থাপন, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থা চালু এবং সংসদে নামাজের জন্য বিরতির যথাযথ ব্যবহারের দাবি জানান জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান।
জবাবে স্পিকার বলেন, ধর্ম পালন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের বিষয়। সংসদ থেকে কোনো নোটিশ দিয়ে কাউকে ধর্ম পালনে বাধ্য করা যায় না। তবে ধর্ম পালনের বিষয়ে সংসদ সদস্যের বক্তব্যের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানান তিনি।
ডেঙ্গু ও যোগাযোগব্যবস্থা
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের আট বিভাগের মধ্যে পাঁচটিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। খুলনা, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে রোগী ও এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হবে।
অন্যদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানান, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ হলে তেজগাঁও টোল প্লাজার চাপ কমবে। পাশাপাশি গণপরিবহনে জিপিএস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গাড়ির অবস্থান, গতি ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
মেট্রোরেলের ৭৩০টি বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৭টিকে ক্রিটিক্যাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও সংসদে জানানো হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী-কলকাতা-রাজশাহী রুটে ট্রেন চালুর বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
সংসদে আরও জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। একই সময়ে বহু কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও পুনঃপৃষ্ঠায়ন এবং বেশ কয়েকটি সেতু, কালভার্ট, ফ্লাইওভার, ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং নগরের বিভিন্ন খাল ও ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অধিবেশনে হাটহাজারীর ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে দুর্ঘটনায় দুই সেনাসদস্য নিহত ও একজন কর্মকর্তা আহত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।








