৮ মাসে ২২৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, আইন সংস্কারের দাবি

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
৮ মাসে ২২৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, আইন সংস্কারের দাবি

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ২২৪ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জন স্কুল ও সমমানের, ৪৭ জন কলেজ ও সমমানের এবং ৫০ জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ১৩২ জন নারী ও ৯২ জন পুরুষ।


সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি তানসেন রোজ। হিসাব অনুযায়ী, গত আট মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৮ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৭১৪টি। ওই বছর দেশে আত্মহত্যার অপরিশোধিত মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ২ দশমিক ৮। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার ছিল প্রতি লাখে ৪ দশমিক ৭।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থী ও তরুণদের আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ও সম্পর্কজনিত সমস্যা, দাম্পত্য কলহ, পড়াশোনায় ব্যর্থতা, পরীক্ষার চাপ, বিষণ্নতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির মতো বিভিন্ন বিষয় এর জন্য দায়ী হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার চেষ্টা তাৎক্ষণিক ও অপরিকল্পিতভাবে ঘটে।


আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা এবং ক্ষতিকর উপকরণের সহজলভ্যতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।


আঁচল ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সাইদ বলেন, আত্মহত্যার কোনো একক কারণ নেই; বরং এটি বিভিন্ন সমস্যার সম্মিলিত ফল। কেউ আত্মহত্যার কথা বললেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাকে মানসিক সহায়তা দিতে হবে।


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে। কেন তিনি এমন অনুভব করছেন, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।


আত্মহত্যার চেষ্টা অপরাধ নয়, মানসিক সমস্যা


বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। এ ধারায় আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত সাধারণ কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।


তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইনবিশেষজ্ঞরা এই আইন সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, আত্মহত্যার চেষ্টা কোনো অপরাধ নয়; এটি গুরুতর মানসিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। তাই শাস্তির পরিবর্তে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।


আইসিডিডিআর,বির মানসিক ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মোহাম্মদ সোহেল সৌমিক বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়, এটি একটি মানসিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নীতিমালার খসড়া সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।


আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে আইনগত ও সামাজিক নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। ফলে তাঁর মানসিক সংকট আরও বাড়তে পারে। এ কারণে আত্মহত্যার বিষয়টিকে রোগ ও মানসিক সমস্যার দৃষ্টিতে মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।


স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, আত্মহত্যাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার কারণে এর সঙ্গে যুক্ত সামাজিক কলঙ্ক আরও বাড়ছে। টেলিকাউন্সেলিং, জনসচেতনতা এবং সহজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সরকার আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো নিয়ে কাজ করবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।


আজ ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘আত্মহত্যা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন’।



এমকে/বিএম২৪