অনিবন্ধিত ‘প্রথম টিভি’ নামে ফেসবুক পেজ বানিয়ে প্রতারণা, থানায় জিডি
সূত্রঃ সংগৃহীত
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
সরকারি নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে প্রশাসনের নাকের ডগায় কুড়িগ্রামে চলছে অনিবন্ধিত প্রথম টিভির অপকর্ম। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত, ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য প্রকাশ, কাজের পারিশ্রমিক না দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ এই নাম সর্বস্ব টিভিকে ঘিরে। দেখার যেন কেউ নেই।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানিয়েছে প্রথম টিভি নামের কোনো সংবাদ মাধ্যমের অনুমোদনের বিষয়টি তারা জানেন না। এটি কোনো টিভি নয়, নয় পত্রিকা বা অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। মূলতঃ এটি ফেসবুক পেইজ যা সংবাদ মাধ্যম হিসেবে কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই চালাচ্ছে একদল প্রতারক।
অন্যদিকে চাকরি দেওয়ার নাম করে এবং সাংবাদিকতার সুযোগ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণী, এমনকি কিশোরীদেরও বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে নাম সর্বস্ব ‘প্রথম টিভি’ অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজকে ঘিরে। এ ঘটনায় শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে কুড়িগ্রাম সদর থানায়একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। যার জিডি নম্বর ১২৬৮।
সাধারণ ডায়েরি সূত্রে জানা গেছে, আবু হাসনাত হিরন নামের এক কিশোর গত নভেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত ‘প্রথম টিভি’তে মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। ওয়েবসাইটে সংবাদ প্রকাশ, সংবাদ সম্পাদনা ও গ্রাফিক ডিজাইনের কাজের বিনিময়ে তাকে মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা বলা হয়। সাত মাস নিয়মিত কাজ করলেও তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয়নি। কয়েক মাস পর পাওনা বেতন চাইলে সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন। একপর্যায়ে হিরন চাকরি ছেড়ে দেন। পরে পাওনা টাকা চাইলে গত ১৯ জুলাই কুড়িগ্রাম কলেজ মোড়ে ‘প্রথম টিভি’র তথাকথিত চেয়ারম্যান ও পরিচালক মোহতাসিম বিল্লার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেখানে বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলে উপস্থিত লোকজন তা শান্ত করেন এবং পাওনা পরিশোধের পরামর্শ দেন।
ওই সময় মোহতাসিম বিল্লা উপস্থিত ব্যক্তিদের সামনে সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধের পরিবর্তে ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় আরমান বিশ্বাস সাকিব ও সুরজিৎ ধর উপস্থিত ছিলেন। পরে মোহতাসিম বিল্লা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে মোবাইল ফোনে বার্তা দিয়ে তিনি ২৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫ হাজার টাকা দিতে পারবেন এবং তা ১০ আগস্ট পরিশোধ করবেন বলে জানান। ১০ আগস্ট টাকা পাওয়ার জন্য হিরন মোহতাসিম বিল্লাকে ফোন করলে তিনি তাকে অশ্লীল ও অশোভন ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে উল্টো থানায় গিয়ে আবু হাসনাত হিরনের নামে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।
এছাড়াও ২ থেকে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দেওয়ার এবং পরে বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদাবাজি করে আয় করা অর্থের অংশ নেওয়ার ব্যবস্থার কথাও একটি কল রেকর্ডে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় ‘প্রথম টিভি’র সঙ্গে মোহতাসিম বিল্লাহ ছাড়াও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. অমূল্য রায় এবং সম্পাদক মাইদুল হাসান মামুনের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে কোনো প্রকার নিবন্ধন না থাকলেও বিভিন্ন বেসরকারি বিজ্ঞাপন প্রচার প্রচারণা চালান। চাকরিরত ভিক্টিমরা অল্প বয়সি হবার কারণে পরিবার কিংবা আশেপাশের কাউকে জানাতে সাহস পায় না। এতে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য তথাকথিত ‘প্রথম টিভি’র চেয়ারম্যান ও পরিচালক মোহতাসিম বিল্লাহর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা অনেকেই নিয়োগপত্র দিয়েছি। আপাতত কাউকে বেতন দিচ্ছি না। আমাদের সংবাদ সম্পাদনা এবং উপস্থাপনা যারা করেন তাদেরকে সামান্য কিছু সম্মানী দেয়া হয়। আবু হাসনাত এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তাকে আমি চিনি না তার ব্যাপারে কিছু জানি না। আমাদের আগে সম্পাদক হাবিবুর রহমান থাকাকালীন সে হয়তো এক সপ্তাহ কাজ করে থাকতে পারে। তিনি হাসনাতের বিরুদ্ধে থানায় যে অভিযোগ করেছেন তা জানতে চাইলে কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ ব্যাপারে জানতে সাবেক সম্পাদক হাবিবুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সেখানে দীর্ঘদিন নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তার কোন ডকুমেন্ট নাই। আবু হাসানাত হিরনের ব্যাপারে জানতে চাইলে বলেন সে কিছুদিন কাজ করেছিল। এরকম অনেকেই কাজ করতেন তাদের কাউকে বেতন দেওয়া হয় নাই।
প্রথম টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কুড়িগ্রাম জেলা যুব ইউনিয়নের আহবায়ক অমূল্য রায় ( যিনি পল্লী চিকিৎসক হয়ে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দেন) মুঠোফোনে কল করে সাংবাদিক পরিচয় শোনার পর তিনি প্রথম টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কি না এই প্রশ্নের জবাব দিতে ইতস্তবোধ করেন এবং ব্যস্ত আছেন বলে কল কেটে দেন।
সম্পাদক মাইদুল হাসান মামুন বিভিন্নজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি মালিক পক্ষের কেউ না। আমার জানামতে নিয়োগকৃতদের কোনো প্রকার বেতন দেওয়া হয় না। আবু হাসনাত হিরনের বকেয়া বেতনের কথা সম্পর্কে বলেন। আমাদের চেয়ারম্যান ও পরিচালক মোহতাসিম বিল্লাহর কাছে এমনিতে সমস্যার কথা শুনেছি। টাকা-পয়সার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।
ভুক্তভোগী শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মা বলেন, আমার নামে ভুয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই না করে এবং আমার মতামত না নিয়ে এই ভুয়া টিভি আমার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেছে। এতে আমার সম্মানহানি করেছে। আমি মানহানির মামলা করার কথা ভাবছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন অনেকেই অভিযোগ করে বলেন অর্থের বিনিময়ে পক্ষপাতিত্ব করে তারা কোন প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া সম্মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করে হেয় প্রতিপন্ন করেন।
কুড়িগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক জাগো বাহে পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক রেজাউল করিম জানান, আমরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পত্রিকা প্রকাশ করি। একটি পত্রিকা বের করতে হলে রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন হয়। সরকারি অনেক বিধিমালা মেনে চলতে হয়। কিন্তু কুড়িগ্রামে কিছু ফেসবুক পেজ অনিবন্ধিত হলেও নিজেদেরকে গণমাধ্যম হিসেবে প্রকাশ করে সংবাদ প্রচার করে আসছে। তারা বিভিন্ন ধরনের ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এতে প্রকৃত গণমাধ্যমের ভাব ভর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। আমরা চাই নিজেদেরকে গণমাধ্যম দাবি করা এই ধরনের সকল অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হোক।
কুড়িগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ কামাল হোসেন বলেন, প্রথম টিভির চেয়ারম্যান ও পরিচালক দাবি করে এক ব্যক্তি থানায় এসে আবু হাসনাত হিরনের নামে একটি জিডি করেছিল। জিডির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কলও দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র বা কোন ডকুমেন্ট থাকলে সেসব নিয়ে থানায় ডাক দেওয়া মাত্র কল কেটে দেয়, তারপর থেকে আর যোগাযোগ হয় নি। পরে আমি অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো জানতে পেরে প্রথম টিভির বিরুদ্ধে করা সাধারণ ডায়েরি অন্তর্ভুক্ত করেছি। পুলিশি তদন্ত প্রক্রিয়াধীন আছে। তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমকে/বিএম২৪









