প্রধান শিক্ষক ছাড়াই বরিশালের ২,৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই বরিশালের ২,৫৯৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়

সূত্রঃ সংগৃহীত

জেলা প্রতিনিধি


বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশ চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ বিদ্যালয়ে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। এর পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও রয়েছে বড় সংকট। ছয় জেলায় এ পদে ৩ হাজার ২৯টি শূন্য রয়েছে।


বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা উপপরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।


শুধু বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও জনবল সংকট প্রকট। ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের মধ্যে ৩১৩টি পদ শূন্য। বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়েও ১৪টি পদের মধ্যে পাঁচটি পদ খালি রয়েছে।


পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ বরিশাল জেলায়। জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে আগৈলঝাড়ায় ৯৭টির মধ্যে ৬০টি, উজিরপুরে ১৮১টির মধ্যে ১১১টি, গৌরনদীতে ১৩১টির মধ্যে ৯০টি, বরিশাল সদরে ২০১টির মধ্যে ৭২টি, বাকেরগঞ্জে ২৭৯টির মধ্যে ১৮১টি, বানারীপাড়ায় ১২৬টির মধ্যে ৮৭টি, বাবুগঞ্জে ১৩৪টির মধ্যে ৭৬টি, মুলাদীতে ১৩৯টির মধ্যে ৯০টি, মেহেন্দীগঞ্জে ২০৮টির মধ্যে ১১৩টি এবং হিজলায় ৯২টির মধ্যে ৫৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।


বিভাগের অন্য পাঁচ জেলাতেও একই সংকট রয়েছে। পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টি, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টি, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টি, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টি এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।


তবে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা বিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি নেতৃত্বহীন নয়। বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে অন্য শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন ‘চলতি দায়িত্বে’ রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী নিয়োগ বা পদোন্নতির পরিবর্তে এভাবেই অস্থায়ী ব্যবস্থায় বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।


প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ও বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা তদারক করেন। ফলে দীর্ঘদিন পদটি শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।


এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি। ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩৩ হাজার ১২৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ। এর মধ্যে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি পদ খালি।


বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ী পদোন্নতি হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসর নিয়েছেন বা মারা গেছেন। এরপরও নতুন করে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।


তিনি বলেন, দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদানের মানও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পদোন্নতি ও নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করা জরুরি।


বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসেও জনবল সংকট রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৭০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৯ জন। উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৫৩৯টি পদের মধ্যে কর্মরত ২২৬ জন। ফলে যথাক্রমে ৩১ ও ৩১৩টি পদ শূন্য রয়েছে।


সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, এটি শুধু শূন্য পদের হিসাব নয়; এর প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের শূন্য পদগুলোও পূরণ করে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।


বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর মো. জাহিদুল কবির তুহিন জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে শিক্ষকসংকটের বড় অংশের সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।




এমকে/বিএম২৪