যে মুঠোফোনের বিরোধে প্রকাশ্যে খুন হলেন সাকিব
সূত্রঃ সংগৃহীত
মোহাম্মদ ইব্রাহিম , চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
একটি মুঠোফোনকে কেন্দ্র করে বিরোধ। সেই বিরোধের জেরে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত রিকশায় করে বাড়ি ফেরার পথে পথরোধ করে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু।
চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁওয়ে মোহাম্মদ সাকিব (২৮) হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে এমনই তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। হত্যার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত প্রথম তিন আসামিসহ মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৭। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত একটি দেশীয় তৈরি চাইনিজ কুড়াল ও একটি সুইচ গিয়ার ছুরি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০ আগস্ট সন্ধ্যায় চান্দগাঁওয়ের মোহরা কামাল বাজার এলাকার লায়লা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে প্রকাশিত সংবাদে পুলিশ জানিয়েছিল, মুঠোফোন নিয়ে পূর্ববিরোধের জেরেই সাকিবকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে।
যে বিরোধ থেকে হত্যাকাণ্ড
র্যাবের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন আগে সাকিবের সঙ্গে মামলার ১ নম্বর আসামি মো. ইমনের বিরোধের সূত্রপাত। ইমন জনৈক আদনানের একটি মুঠোফোন জোর করে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। সাকিব এর প্রতিবাদ করেন। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় ইমনের কাছ থেকে মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইমন ও ২ নম্বর আসামি মো. রায়হানের সঙ্গে সাকিবের বিরোধ তৈরি হয় বলে র্যাব জানিয়েছে।
ঘটনার পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনও বলেছিলেন, মুঠোফোন নিয়ে সাকিবের পূর্বপরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধ ছিল এবং সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
অর্থাৎ, যে ঘটনাটি প্রথমে একটি মুঠোফোন নিয়ে বিরোধ হিসেবে সামনে এসেছিল, তদন্তে সেটিই হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য পূর্বসূত্র হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রিকশা থামিয়ে হামলা
র্যাবের তথ্যমতে, ২০ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে সাকিব তাঁর প্রতিবেশী মো. নাবিল হাসান জিসানের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে মোহরা মৌলভী বাজার এলাকা থেকে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন।
রিকশাটি লায়লা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে পৌঁছালে আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামি ও তাঁদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন। তাঁদের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল বলে র্যাবের ভাষ্য।
অভিযোগ অনুযায়ী, রিকশার গতিরোধ করে ইমন সাকিবের শার্টের কলার ধরে তাঁকে রিকশা থেকে নামিয়ে আনেন। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। সাকিব রাস্তায় পড়ে গেলে অন্যরাও তাঁকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন বলে মামলার এজাহার ও র্যাবের তথ্যে বলা হয়েছে।
পরে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনাতেও সাকিবকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখার কথা উঠে আসে। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রথমে ছিল ‘ছুরিকাঘাত’, পরে সামনে আসে সংঘবদ্ধ হামলার তথ্য
হত্যার পরপর প্রকাশিত সংবাদগুলোতে ঘটনাটিকে পূর্বপরিচিত কয়েকজনের হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কোথাও বলা হয়, কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সাকিবকে ছুরিকাঘাত করা হয়; আবার প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে রিকশা থামিয়ে হামলার কথাও উঠে আসে।
পরে মামলার এজাহার ও র্যাবের অনুসন্ধানে হত্যাকাণ্ডের আরও বিস্তারিত বর্ণনা সামনে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সাকিবকে বহনকারী রিকশার গতিরোধ করে তাঁকে নামিয়ে হামলা চালানো হয় এবং সেখানে একাধিক ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
এ কারণে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে হত্যাকাণ্ডটি কি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকে ঘটেছে, নাকি আগের বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছিল?
মামলার এজাহারে পুলিশকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার সুযোগ রেখেই আসামিদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলার অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় তিনজনের নাম, পরে গ্রেপ্তার আট
সাকিব হত্যার ঘটনায় তাঁর বাবা মো. নজুম উদ্দিন বাদী হয়ে চান্দগাঁও থানায় মামলা করেন। ২১ আগস্ট দায়ের করা মামলাটির নম্বর ২১। এতে তিনজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে এবং আরও ছয় থেকে সাতজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪২, ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন
মো. ইমন (২২), মো. রায়হান (২৫), মো. শাহেদ সালমান (২২), মোহাম্মদ হোসেন (২২), হাসান মোহাম্মদ রবিউল (২১), মো. সাকিব হোসেন (১৮), মো. আছমান (২৩) ও মো. ফয়সাল (২৩)।
র্যাব জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলা, চট্টগ্রাম মহানগর এবং কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পালিয়ে ছিলেন বিভিন্ন এলাকায়
আটজনের মধ্যে কেউ চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা, কেউ জেলার বিভিন্ন উপজেলা এবং একজন কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার বাসিন্দা। ফলে হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তদের কেউ কেউ নিজ এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলেন কি না, সেটিও তদন্তের একটি বিষয় হতে পারে।
র্যাবের অভিযানের বিস্তৃতি থেকে অন্তত এতটুকু স্পষ্ট যে, গ্রেপ্তার অভিযান শুধু ঘটনাস্থল চান্দগাঁওয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকা এবং কক্সবাজারেও অভিযান চালানো হয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধার, এখন প্রশ্ন পরিকল্পনার
র্যাবের অভিযানে একটি দেশীয় তৈরি চাইনিজ কুড়াল ও একটি সুইচ গিয়ার ছুরি উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এসব অস্ত্র হত্যাকাণ্ডে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে কি না এবং উদ্ধার করা অস্ত্রের সঙ্গে মামলার আলামতের মিল রয়েছে কি না এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া হামলায় কতজন সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন, কে কার কী ভূমিকা পালন করেছেন, হামলার আগে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং হত্যার পর কারা তাঁদের আশ্রয় বা পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে এসব প্রশ্নের উত্তরও এখন তদন্তের অংশ।
৪৮ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার, তবে তদন্তের বাকি প্রশ্নগুলো
হত্যাকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আটজন গ্রেপ্তার হওয়াকে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র্যাব-৭-এর সিপিসি-৩ বদ্দারহাট-চান্দগাঁও ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. তাওহিদুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে আটজন গ্রেপ্তার হলেও হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য এখনো তদন্তসাপেক্ষ। বিশেষ করে, মুঠোফোন উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, সেটি কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যে হত্যার মতো ভয়াবহ পরিণতিতে গেল এ প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
একটি মুঠোফোন নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হওয়া ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একজন তরুণের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এখন তদন্তে প্রমাণ করতে হবে সেদিন ঘটনাস্থলে আসলে কী ঘটেছিল, কারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিল এবং হত্যার পেছনে তাৎক্ষণিক বিরোধের বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। একই সঙ্গে উদ্ধার করা অস্ত্র ও অন্যান্য আলামত মামলার তদন্তে যাচাই করা হবে।
এমকে/বিএম২৪









