জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য ও দলীয়করণ নিয়ে এনসিপির সমালোচনা
সূত্রঃ সংগৃহীত
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ‘অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনাহীনতা ও অসচ্ছতার’ সময় হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার আগে সংস্কার, সুশাসন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি দিয়েছিল, ছয় মাসে তার দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, কর্মসংস্থান হারানো, প্রশাসনে দলীয়করণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সোমবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোডের হোটেল সৈকতে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার সাংগঠনিক সমন্বয় সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। এ সময় কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে একই দিন ঢাকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের পলিসি ও রিসার্চ বিষয়ক উপকমিটির সংবাদ সম্মেলনেও বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়। সেখানে দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন।
‘ছয় মাসেই সরকারের গতিপথের আলামত স্পষ্ট’
সারোয়ার তুষার বলেন, পাঁচ বছরের একটি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড দিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায় না। তবে এই সময়ে সরকারের কাজের ধরন ও ভবিষ্যৎ গতিপথের আলামত স্পষ্ট হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডকে চারটি শব্দে তুলে ধরা যায়—‘অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনাহীনতা এবং অসচ্ছতা তথা প্রতারণা’।
এনসিপির এই নেতা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে সংস্কারের কৃতিত্ব দাবি করেছিল এবং সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা ‘পুরোনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি’ করছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে প্রশ্ন
সরকারের প্রথম দিকের জ্বালানি সংকট নিয়েও প্রশ্ন তোলে এনসিপি। সারোয়ার তুষারের দাবি, তখন জ্বালানির মজুতের ঘাটতি ছিল না; বরং সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, সেই সংকটকে কেন্দ্র করে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
জ্বালানি সংকটের পর বিদ্যুৎ খাতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করে এনসিপি। দলটির ভাষ্য, বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট সময়সূচি দিয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারেও আগের মতোই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য রয়েছে।
‘কর্মসংস্থান দেওয়ার বদলে মানুষ চাকরি হারাচ্ছে’
সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সারোয়ার তুষার। তাঁর দাবি, বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
এনসিপির হিসাবে, ইতিমধ্যে ৬২ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও নিম্নমুখী বলে দাবি করেন তিনি।
চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করে এনসিপি।
সারোয়ার তুষার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গল সলিমপুরে গিয়েছেন; কিন্তু এর কাছাকাছি রাউজানে দলীয় কোন্দল, দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তাঁর দাবি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাউজানে এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
‘রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ চলছে’
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নেতা-কর্মীদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে এনসিপি।
দলটির নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিদেরও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে সরকারি ও ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ এবং বড় প্রকল্পে মধ্যস্থতার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন সারোয়ার তুষার। তিনি একটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য চুক্তি এবং এক ব্যক্তির কনসালট্যান্সি নিয়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেন।
তাঁর দাবি, প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ৩ শতাংশ কমিশন হলে এর পরিমাণ বিপুল। তবে এ অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।
ক্রিকেট বোর্ড নিয়েও অভিযোগ
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিভিন্ন কমিটিতে যোগ্যতা ও রাজনৈতিক ভূমিকা বিবেচনা না করে ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও তোলেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক প্রভাবের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে নিয়োগ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ‘বাপের দোয়ার কমিটিতে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগও করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এনসিপির দাবি, সরকার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এমন নজরদারি সরঞ্জাম কিনেছে, যার মাধ্যমে কনটেন্ট ব্লক, কনটেন্ট অপসারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ট্র্যাক করা সম্ভব।
এ ছাড়া সাংবাদিকদের হয়রানি এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন দলটির নেতারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও তুলে ধরে এনসিপি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়নি।
গণভোট ও সংস্কার নিয়ে ‘প্রতারণার’ অভিযোগ
গণভোটের বিষয়টিকেও সরকারের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরে এনসিপি।
সারোয়ার তুষারের দাবি, নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দলটির অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।
এনসিপির ভাষ্য, জনগণের সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নির্বাচনী সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
এর আগে একই দিন ঢাকায় নাহিদ ইসলামও বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিনে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কোনোটিই পূরণ করতে পারেনি।
বাস্তবায়ন হয়নি মিডিয়া কমিশন
গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগও করেছে এনসিপি।
সারোয়ার তুষার বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই পথে এগোয়নি।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়েও অভিযোগ
সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নিয়েও অভিযোগ তোলেন এনসিপির নেতারা।
তাঁদের অভিযোগ, কর্মসূচির তালিকা তৈরির দায়িত্বে দলীয় নেতা-কর্মীদের যুক্ত করার জন্য মাঠ প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ইউএনও, ডিসি ও এসি ল্যান্ডসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
সারোয়ার তুষারের দাবি, কোনো কোনো এলাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তালাবদ্ধ করা, হুমকি দেওয়া ও অপদস্থ করার ঘটনাও ঘটছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যে বিচ্ছিন্ন মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সরকারের আমলে সেটি ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাতিষ্ঠানিক মবে’ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার ও গুম কমিশন নিয়েও প্রশ্ন
মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত আইন নিয়েও সমালোচনা করেছে এনসিপি।
সারোয়ার তুষারের দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের করা অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকার যে নতুন আইন করেছে, তা আগের আইনের চেয়েও দুর্বল। এতে ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনে সাবেক বিচারপতির নিয়োগ নিয়েও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন তিনি।
‘পাঁচ বছর টিকবে না’—এনসিপির আশঙ্কা
সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও মন্তব্য করেন সারোয়ার তুষার।
তিনি বলেন, ছয় মাসে সরকারের কর্মকাণ্ডের যে নজির দেখা যাচ্ছে, তাতে তাঁরা উদ্বিগ্ন। বিএনপির ‘খাই-খাইয়ের মাত্রা’ দেখে দলটির নেতা-কর্মীরাও মনে করছেন, সরকার হয়তো পাঁচ বছর টিকবে না—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে দ্রুত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব এ এস এম সুজা উদ্দিন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, জাতীয় যুবশক্তির সেক্রেটারি ফরহাদ সোহেল, জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদারসহ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এনসিপির এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি বা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।









