ইসির ১৪৩ জনের নিয়োগে বিতর্ক: নথিতে কেন্দ্রীয় অনুমোদন, শাস্তি শুধু মাঠ কর্মকর্তার
ইব্রাহীম হোসেন সম্রাট, রাজশাহী ব্যুরো:
রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ১৪৩ জন জনবল নিয়োগকে ঘিরে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। তবে সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্দেশনা, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কেন্দ্রীয় অনুমোদনে সম্পন্ন হওয়া একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন কেবল মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া হলো?
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, গত ২৩ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় রাজশাহী অঞ্চলের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের নির্দেশনা জারি করে। একই দিনে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) ই-জিপি পদ্ধতির পরিবর্তে ডাইরেক্ট প্রোকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) অনুসরণের অনুমোদন দেয়।
পরবর্তীতে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে গত ২৯ জুন কেএসএফ ট্রেড লিমিটেড-কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৫ জন চালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ৬৯ জন নিরাপত্তা প্রহরীসহ মোট ১৪৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে, এর মধ্যে আগে থেকেই কর্মরত ১৩৭ জন কর্মীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি একটি ইউটিউবভিত্তিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করে।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া সরকারি নথিপত্র কিংবা প্রকাশ্যে আসা তথ্য-উপাত্তে এখন পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ভর করছে চলমান তদন্তের ফলাফলের ওপর।
এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া ও রাজপাড়া এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ নির্বাচন অফিসে কর্মরত কয়েকজন আউটসোর্সিং কর্মী দাবি করেছেন, নিয়োগের জন্য তাঁদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কেএসএফ ট্রেড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসাইন বলেন, "নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করেনি।"
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "সরকার নির্ধারিত নীতিমালা, বিপিপিএর অনুমোদন এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কোনো অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই।"
প্রশাসনিক ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, যেহেতু নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বিপিপিএ, মূল্যায়ন কমিটি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাই তদন্তের পরিধি কেবল একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা এবং দায়-দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।









