‎আবু সিদ্দিক হত্যা: প্রকৃত হত্যাকারীকে আড়াল করে সাক্ষীদের আসামি করা হয়েছে? তদন্ত ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
‎আবু সিদ্দিক হত্যা: প্রকৃত হত্যাকারীকে আড়াল করে সাক্ষীদের আসামি করা হয়েছে? তদন্ত ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন

মোহাম্মদ ইব্রাহিম,  চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানাধীন মনছুরাবাদের বহুল আলোচিত আবু সিদ্দিক হত্যা মামলার তদন্তকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং মামলায় গ্রেপ্তার কয়েকজনের স্বজনরা। তাঁদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার পরিবর্তে মামলার তদন্ত এমন পথে পরিচালিত হচ্ছে, যাতে প্রকৃত অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

‎এ অভিযোগের প্রতিবাদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর মনছুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসের সামনে মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেন এলাকাবাসী। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা এক নম্বর আসামি শেখ আহাম্মদ রুবেল, সাইফুল ও তাঁদের সহযোগীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে মামলার ৫ থেকে ৭ নম্বর আসামিকে নির্দোষ দাবি করে তাঁদের মুক্তির আহ্বান জানান।

'সাক্ষী থেকে আসামি' তদন্তে উঠছে প্রশ্ন

‎মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, ঘটনার রাতে মারধরের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যাঁদের নাম উঠে এসেছিল, তাঁদের মধ্য থেকেই তিনজনকে পরবর্তীতে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে।

‎তাঁদের ভাষ্য, এ তিনজন ঘটনার সাক্ষ্য দিলে মামলার মূল আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারত। কিন্তু তাঁদেরই আসামি করায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

‎মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বসর আহম্মদ, পেয়ার আহম্মদ ও রাব্বানীকে সাক্ষী না করে আসামি করার ফলে মামলার গতিপথ পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

'মূল আসামিকে বাঁচানোর চেষ্টা' অভিযোগ এলাকাবাসীর

‎কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়া স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রধান আসামি শেখ আহাম্মদ রুবেলের বিরুদ্ধে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো, নিম্ন আয়ের মানুষদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল।

‎তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ নিয়ে আগে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রুবেল বা তাঁর পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিসিটিভি ফুটেজ নিয়েও প্রশ্ন

‎মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত হতে পারত ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ। তাঁদের দাবি, কিছু ফুটেজ নষ্ট হয়ে গেছে অথবা গায়েব করা হয়েছে।

‎স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, জুয়েল নামের এক ব্যক্তি সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলতে বা নষ্ট করতে সহায়তা করেছেন। তাঁরা দাবি করেন, ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

হুমকির অভিযোগ

‎মানববন্ধনে অংশ নেওয়া কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মূল আসামির পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ কী বলছে

‎ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, "হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আর তদন্তে যদি কারও সম্পৃক্ততা না পাওয়া যায়, তাহলে তাকে হয়রানি করা হবে না।"

‎ব্যাটারি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, "ঘটনার আগে ব্যাটারি চুরির বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি। বিষয়টি পুলিশ জানত না। যদি আগে এ ধরনের কোনো তথ্য পেতাম, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত।"

‎সিসিটিভি ফুটেজ সম্পর্কে তিনি বলেন, "ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের গ্যারেজে একটি ক্যামেরা থাকলেও সেটি আগে থেকেই নষ্ট ছিল। তবে আশপাশের যেসব স্থানে কার্যকর সিসিটিভি রয়েছে, সেখান থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আরও ফুটেজ জব্দ করা হবে এবং যেসব আলামত পাওয়া যাবে, সেগুলো তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।"

‎তদন্তের নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ওসি বলেন, "পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা সম্ভব নয়। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

উঠছে যেসব প্রশ্ন

‎মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ এবং পুলিশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে 

‎যাঁদের প্রত্যক্ষদর্শী বলা হচ্ছে, তাঁদের কোন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামি করা হয়েছে?

‎ঘটনার আশপাশের সব কার্যকর সিসিটিভি ফুটেজ কি পুলিশ সংগ্রহ করেছে?

‎ঘটনার আগে বিরোধ বা উত্তেজনার তথ্য স্থানীয়ভাবে থাকলেও কেন তা পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি?

‎তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ উঠছে, তাঁদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে কি?

‎ফরেনসিক আলামত, ডিজিটাল তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

তদন্তই দেবে উত্তর

‎আবু সিদ্দিক হত্যা মামলাকে ঘিরে এখন দুই ধরনের বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর একাংশ তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন; অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বা নির্দোষ বলা হবে না।

‎তদন্তে সংগৃহীত সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কারা প্রকৃত অপরাধী এবং অভিযোগগুলোর কতটা সত্যতা রয়েছে।