রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতায় বদলাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি, চাপে যুক্তরাষ্ট্র
সূত্রঃ ফাইল ছবি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্ব রাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের মধ্যেই আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে মস্কো ও বেইজিংয়ের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের বিশ্বব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার আলোচনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আরও ঘনিষ্ঠ রাশিয়া-চীন
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে অবস্থান করেছে। তবে গত কয়েক বছরে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান এবং রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক সক্রিয়তা সেই একক আধিপত্যের চিত্র বদলে দিচ্ছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিপরীতে চীন রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া—তিন দেশই পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় তাদের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠেছে।
ইরানকে ঘিরে নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ব্রিকসের সদস্য ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই নৌপথে অস্থিরতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ভারতও রাখছে ভারসাম্য
এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ভারত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও কিছুটা টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে।
রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং শুল্কনীতি নিয়ে ভারতের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি নিয়েও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনার পর ভারত ও চীনও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
ফলে ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখছে। এর মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লি মূলত নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
পশ্চিমা জোটেও মতপার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু রাশিয়া, চীন কিংবা ইরানকে ঘিরেই নয়। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের ভেতরেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য বাড়ছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যয় ও দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতেও ইউরোপের সব দেশ সবসময় ওয়াশিংটনের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হচ্ছে না। ফলে পশ্চিমা জোটের ঐক্য আগের তুলনায় কতটা শক্তিশালী রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার মঞ্চ ব্রিকস?
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্রিকসের গুরুত্বও বাড়ছে। জোটটির সদস্য দেশগুলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি তুলছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও ব্রিকসের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এর অর্থ সরাসরি মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কার এবং আরও স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে ব্রিকস।
ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট?
ব্রিকসকে অনেক সময় পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবতা এতটা সরল নয়। রাশিয়া ও চীন অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমাতে ব্রিকসকে গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী। তবে ভারতসহ অনেক সদস্য দেশ সরাসরি পশ্চিমবিরোধী অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়।
ভারতের নীতিতে এর পরিবর্তে দেখা যায় ‘কৌশলগত স্বাধীনতা’র প্রবণতা। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও রাশিয়া, চীন ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা।
এ কারণেই ব্রিকসকে এখনো ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো সামরিক কিংবা রাজনৈতিক জোট বলা যায় না। বরং এটি অর্থনীতি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার বিকল্প কাঠামো নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কী পথ?
রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত, ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে মতপার্থক্য—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র রাতারাতি বিশ্ব নেতৃত্ব হারাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা এবং বিস্তৃত মিত্রজোট এখনো ওয়াশিংটনের বড় শক্তি।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বদলাচ্ছে—এটি স্পষ্ট। একক আধিপত্যের পরিবর্তে বিশ্ব ধীরে ধীরে আরও বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠতা, ইরানের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা, ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এবং ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে প্রভাব ধরে রাখা যথেষ্ট নাও হতে পারে। মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক কৌশল পুনর্বিন্যাস এবং উদীয়মান শক্তিগুলোর সঙ্গে নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে ওয়াশিংটনের সামনে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এনডিটিভি








