স্নাতক শেষের আগেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ‘বেস্ট পেপার’ জিতলেন জাবিপ্রবির তানভীর
সূত্রঃ বিডি মেইল
মো. ইকরাম মাহমুদ প্রধান, জাবিপ্রবি প্রতিনিধি
স্নাতক শেষ করার আগেই আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনে ‘IEEE Best Paper Award’ পেয়েছেন জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE) বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তানভীর। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশকে চৌম্বকীয় উদ্দীপনার মাধ্যমে সক্রিয় করার সম্ভাবনা নিয়ে কম্পিউটেশনাল ব্রেন স্টিমুলেশন বিষয়ে গবেষণা করে এ স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (IUBAT) বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘5th IEEE BECITHCON 2026’ সম্মেলনে তানভীরকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। সম্মেলনটির পূর্ণাঙ্গ নাম ‘IEEE International Conference on Biomedical Engineering, Computer and Information Technology for Health’। তিনি জাবিপ্রবির ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
তানভীরের গবেষণার বিষয় ছিল ‘Transcranial Magnetic Stimulation’ (TMS)-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটারের সর্বোত্তম মান নির্ধারণ। মস্তিষ্কের ‘Left Dorsolateral Prefrontal Cortex’ বা F3 অঞ্চলে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগ করে কীভাবে নির্দিষ্ট নিউরাল কার্যক্রমকে উদ্দীপিত করা যায়, তা নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন তিনি। গবেষণার ফল ভবিষ্যতে বিষণ্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় এ ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
গবেষণাটি তিন ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথম ধাপে TMS-এর জন্য উপযুক্ত কয়েল নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে নির্দিষ্ট স্থানে কয়েল স্থাপন করে এর সর্বোত্তম কোণ নির্ধারণ করা হয়। তৃতীয় ধাপে কয়েল ও মাথার মধ্যকার দূরত্বের সঙ্গে ইলেকট্রিক ফিল্ডের শক্তির ভারসাম্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ওপেন সোর্স সিমুলেশন সফটওয়্যার ‘SimNIBS’ ব্যবহার করা হয়েছে।
তানভীর জানান, গবেষণার শুরুর দিকে পর্যাপ্ত রিসোর্সের অভাব ও অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। পরে নিয়মিত সাহিত্য পর্যালোচনা (লিটারেচার স্টাডি) এবং একাডেমিক সুপারভাইজারের পরামর্শে ধীরে ধীরে গবেষণার কাজ এগিয়ে নেন।
নিজের গবেষণার সাফল্যের পেছনে একাডেমিক সুপারভাইজার ও EEE বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসানের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তানভীর। ছোটবেলা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও নিজেকে বিভাগের একজন ‘গড়পড়তা শিক্ষার্থী’ মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, গবেষণার প্রতি আগ্রহ, নিয়মিত পরিশ্রম এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই তাঁকে এ অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়েছে।
গত ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৭০০টির বেশি গবেষণাপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে প্রায় ১৭০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয়। ৪ সেপ্টেম্বর সকালে নিজের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন তানভীর। এ সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
তবে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না তানভীর। ৫ সেপ্টেম্বর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকলেও তিনি সেখানে যাননি। পরে সন্ধ্যায় ফোনে জানতে পারেন, তাঁর গবেষণাপত্রটি ‘Best Paper Award’ নির্বাচিত হয়েছে। পুরস্কারের সঙ্গে তাঁকে ১০ হাজার টাকা প্রাইজমানিও দেওয়া হয়।
তানভীর বলেন, প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। পরে সম্মেলন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।
তানভীরের এ অর্জনে আনন্দ প্রকাশ করেছেন তাঁর একাডেমিক সুপারভাইজার ও EEE বিভাগের প্রভাষক মো. আমিমুল ইহসান। এর আগে ২০২৪ সালেও শিক্ষক হিসেবে তিনি একই পুরস্কার পেয়েছিলেন।
মো. আমিমুল ইহসান বলেন, “শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি প্রথম এবং নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তানভীরের গবেষণার ধারণাটি খুবই চমৎকার ছিল।”
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভালো গবেষক হওয়ার জন্য একটি রিসার্চ মাইন্ডসেট তৈরি করতে হবে। শুধু ভালো ফলাফল করার চিন্তা করলেই হবে না; আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং গবেষণায় ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তানভীর আমাদের সব শিক্ষার্থীর জন্য একটি অনুপ্রেরণা। কোনো একটি বা দুটি সেমিস্টার খারাপ গেলেই কারও ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায় না।”
তানভীরের গবেষণাটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সিমুলেশনভিত্তিক। ফলে বাংলাদেশে এর ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে উন্নত ল্যাব সুবিধাসম্পন্ন দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করতে চান তিনি। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটেশনাল ব্রেন স্টিমুলেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) হেলথকেয়ার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।
এমকে/বিডিমেইল২৪









