দিল্লিকে ঢাকার কঠিন শর্ত: নেপথ্যে ‘অবিশ্বাস’, নাকি সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় ঢাকা?

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
দিল্লিকে ঢাকার কঠিন শর্ত: নেপথ্যে ‘অবিশ্বাস’, নাকি সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় ঢাকা?

সূত্রঃ সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দ্বিপক্ষীয় সফর আয়োজন নিয়ে দিল্লির আগ্রহ থাকলেও বাংলাদেশ সফরের আগে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। ঢাকার এই অবস্থানকে সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।


বাংলাদেশ প্রথমে সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণে আগ্রহ দেখায়নি। বরং ঢাকা দ্বিপক্ষীয় সফরকে অগ্রাধিকার দেয়। এরপর ভারত চলতি আগস্টেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর আয়োজনের উদ্যোগ নেয়।


তবে দিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকা। এর কয়েক দিন পর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। পরে তিনি দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।


এরপর আবারও সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এমনকি সফরের সম্ভাব্য সময় নিয়েও দুই দেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু সফরের আগে ঢাকার পক্ষ থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির বিষয়টি সামনে এনে কয়েকটি শর্ত দেওয়া হয়।


ঢাকার প্রধান দুই শর্ত


বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারত সফরের আগে দুটি বিষয়ে দিল্লির ইতিবাচক পদক্ষেপ চায় ঢাকা।


প্রথমত, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হবে।


দ্বিতীয়ত, শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার অভিযুক্তদের বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে হবে।


এসব বিষয়ে ভারতকে জানানো হয়েছে এবং দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।


শর্ত নিয়ে দিল্লিতে প্রশ্ন


সফরের ঠিক আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন শর্ত দেওয়ায় ভারতে বিস্ময় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে।


ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, উত্থাপিত বিষয়গুলো ভারতের অজানা নয়। তবে এগুলোকে সফরের পূর্বশর্ত হিসেবে সামনে আনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে যেসব বিরোধ রয়েছে, সেগুলোর সমাধানে আলোচনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ পর্যালোচনায় রয়েছে। অর্থাৎ এ বিষয়ে দিল্লির অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই।


কেন এত কঠোর অবস্থান ঢাকার?


বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এমন অবস্থানের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার চেষ্টা এবং এসব বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ঢাকার অবিশ্বাস।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে যান। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও দেশ ছাড়েন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।


সম্প্রতি দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় ঢাকার উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ মনে করছে, ভারত থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়টি দিল্লি অস্বীকার করেছে।


সম্পর্ক ‘রিসেট’ করতে চায় ঢাকা?


সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুরোনো কাঠামো নিয়ে ঢাকার মধ্যে নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।


তাঁর মতে, বাংলাদেশ এখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রেখে নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক সাজাতে চাইছে। এ অর্থে বর্তমান অবস্থানকে সম্পর্কের এক ধরনের ‘রিসেট’ বা পুনর্বিন্যাসের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।


তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, কিছু বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও আলোচনার পথ বন্ধ করা উচিত নয়। পানি, সীমান্ত হত্যা, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন।


সম্পর্ক কি আরও জটিল হবে?


ঢাকার কঠোর অবস্থানের কারণে তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত হলেও দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে—এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।


তাদের মতে, সম্পর্কের নতুন ভিত্তি নির্ধারণে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা জরুরি। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হলে অনেক জটিলতার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।


সুতরাং, তারেক রহমানের ভারত সফর কবে হবে তা এখনো অনিশ্চিত। তবে সফরের আগে ঢাকার উত্থাপিত শর্ত এবং সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের প্রত্যাশা কীভাবে সমাধান হয়, তার ওপরই আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।



এমকে/বিএম২৪