কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে নিত্য শিডিউল বিপর্যয়, ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চরম যাত্রী ভোগান্তি
সূত্রঃ সংগৃহীত
শাহীন আহমেদ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের মানুষের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রত্যাশার ফসল আন্তনগর ট্রেন ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’। তবে চালুর পর থেকেই নানা সময়ে শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে এক থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চলাচল করছে ট্রেনটি। চলতি আগস্টে একদিন প্রায় ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বের ঘটনাও ঘটেছে। সর্বশেষ ১৮ আগস্টও প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বে ট্রেন চলাচল করেছে।
এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতিতে ট্রেনটির ওপর যাত্রীদের আস্থাও কমছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন ঘুরে ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে ট্রেনটির স্টেশনে পৌঁছানো কিংবা ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা এখন অনেকটাই ব্যতিক্রম। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে পরীক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা কিংবা জরুরি কাজে যাতায়াতকারী অনেক যাত্রী সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। বাধ্য হয়ে অনেকে সড়কপথে যাতায়াত করছেন।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস ও লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে ব্যবহৃত মিটারগেজ ইঞ্জিনগুলোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ট্রেনগুলো নির্ধারিত গতি ধরে রাখতে পারছে না। দীর্ঘ পথে চলার সময় ইঞ্জিনের গতি কমে যাওয়া বা বিকল হওয়া এবং একদিন শিডিউল ভেঙে গেলে পরবর্তী কয়েক দিন এর প্রভাব অব্যাহত থাকায় নিয়মিত সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় ভোর ৫টা ১০ মিনিট এবং ঢাকা অভিমুখে ছেড়ে যাওয়ার সময় সকাল ৭টা ১০ মিনিট।
গত ২৪ জুলাই ট্রেনটি কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছায় সকাল ৯টায় এবং ছেড়ে যায় সকাল ১০টা ১০ মিনিটে। ওই দিন প্রায় তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়। পরদিন ২৫ জুলাই ট্রেনটি ৪০ মিনিট বিলম্বে ছাড়ে। ২৬ জুলাই স্টেশনে পৌঁছায় সকাল ৭টা ১০ মিনিটে এবং ছাড়ে সকাল ৮টা ৫ মিনিটে। ২৭ জুলাই পৌঁছায় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে এবং ছাড়ে সকাল ৮টায়।
২৮ জুলাই ট্রেনটি ৩৫ মিনিট বিলম্বে এলেও নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। ২৯ জুলাই সময়সূচি ঠিক থাকলেও ৩০ জুলাই আবার বিলম্ব শুরু হয়। সেদিন ট্রেনটি সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে এসে সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে যায়, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট দেরি হয়।
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ৩১ জুলাই ঢাকা থেকে আসা ট্রেনটি রংপুরে বিলম্বে পৌঁছানোয় কুড়িগ্রাম থেকে সকাল সাড়ে ৮টায় একটি শাটল ট্রেন যাত্রী নিয়ে রংপুরের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে ওই ট্রেন ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের নিয়ে সকাল ১১টায় কুড়িগ্রামে ফিরে আসে। ওই দিন প্রায় চার ঘণ্টা বিলম্বের শিকার হন যাত্রীরা।
১ আগস্ট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস পার্বতীপুর পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়। পরে সকাল ৯টায় কুড়িগ্রাম থেকে একটি শাটল ট্রেন পার্বতীপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সেখানে ঢাকা থেকে আসা যাত্রীদের নিয়ে বিকেল ৪টায় ট্রেনটি কুড়িগ্রামে ফিরে আসে। ফলে সেদিন যাত্রীদের প্রায় ৯ ঘণ্টা বিলম্বের শিকার হতে হয়।
একই ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রীরাও। গত ১৫ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত সময়সূচি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময়ে শাটল ট্রেনটি মাত্র চার দিন নির্ধারিত সময়ে চলেছে। অন্য দিনগুলোতে দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। সর্বশেষ ১৮ আগস্ট রংপুর এক্সপ্রেসের শাটল ট্রেনটি সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি ছাড়ে সকাল সাড়ে ৯টায়।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম যাওয়ার পথে ট্রেনটি নয়টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। এ ছাড়া ক্রসিং, যাত্রী ওঠানামা, গন্তব্যে পৌঁছে কোচ পরিষ্কার ও জ্বালানি সংগ্রহসহ বিভিন্ন কারণে বিলম্ব আরও বাড়ে। একবার সময়সূচি ভেঙে গেলে পরবর্তী কয়েক দিনও এর প্রভাব থেকে যায়।
ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী যাত্রী হুমায়ুন কবির সূর্য বলেন, ৩১ জুলাই রাতে কমলাপুর থেকে ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টার বেশি দেরিতে ছাড়ে। পরে বিভিন্ন স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এবং ফুলবাড়ীর আগে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার কারণে পার্বতীপুরে পৌঁছাতে সকাল সাড়ে ১০টা বেজে যায়। সেখানে জানানো হয়, ট্রেনটি আর কুড়িগ্রাম যাবে না। পরে শাটল ট্রেনে যাত্রী পরিবহনের ঘোষণা দেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে তিনি শেষ পর্যন্ত সড়কপথে কুড়িগ্রাম ফেরেন।
তার ভাষায়, ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস এখন ভোগান্তির আরেক নাম।’
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিজু সরকার বলেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাকে ঢাকা-কুড়িগ্রাম যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু খুব কম দিনই ট্রেন সময়মতো চলে। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে অনেক সময় শুক্রবার সকালের ক্লাসেও উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয় না।
রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ আন্দোলন গণকমিটির সমন্বয়ক মো. নাহিদ হাসান বলেন, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে দীর্ঘদিনের পুরোনো ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণেই নিয়মিত শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে।
তিনি অভিযোগ করেন, উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রতি রেলওয়ের অবহেলা ও বৈষম্যের কারণে পুরোনো ইঞ্জিন সরবরাহ করা হচ্ছে। বিকল্প শাটল ট্রেনে যাত্রীদের রংপুর ও পার্বতীপুরে পরিবহন করতে হচ্ছে। এমনকি যাত্রীদের রেলবিমুখ করতে বাসমালিকদের সঙ্গে রেলওয়ের কোনো অসাধু চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনের ইনচার্জ কনিকা আক্তার বলেন, বাসমালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আঁতাতের অভিযোগের ভিত্তি নেই। মূলত ইঞ্জিন সংকটের কারণেই সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে।
লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ধীমান ভৌমিক বলেন, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বুড়িমারী ও রংপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ঢাকা থেকে দেওয়া হয়। একসময় রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ব্যবহারযোগ্য ইঞ্জিনের সংখ্যা ছিল ১২০টি। বর্তমানে তা কমে ৭০টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তুত ও ব্যবহারযোগ্য ইঞ্জিনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মিটারগেজ ট্রেন হওয়ায় ব্রডগেজ ট্রেনের সঙ্গে ক্রসিং, একক লাইন এবং ইঞ্জিনের সীমিত সক্ষমতাও বিলম্বের অন্যতম কারণ।
রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মো. ফেরদৌস বলেন, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের শিডিউল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। নতুন ইঞ্জিন সরবরাহ করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে কবে নাগাদ কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে নতুন ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তিনি।
ফলে দীর্ঘদিনের শিডিউল বিপর্যয় থেকে কবে মুক্তি মিলবে—এখন সেই অপেক্ষাতেই রয়েছেন কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের হাজারো রেলযাত্রী।









