আটঘরিয়া উপজেলার নামকরণের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান
ফাইল ছবি
মো. আরিফুল ইসলাম, পাবনা জেলা প্রতিনিধি
পাবনা জেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত আটঘরিয়া উপজেলা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি জনপদ। প্রাচীন নামকরণের জনশ্রুতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে উপজেলাটির রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
আটঘরিয়া নামকরণের ইতিহাস
আটঘরিয়া নামকরণ নিয়ে এলাকায় একটি প্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে। কথিত আছে, প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে প্রথম আটটি পরিবার বা আটজন ব্যক্তি বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের নির্মিত আটটি ঘরকে কেন্দ্র করেই জনপদটি ‘আটঘরিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে এ নামকরণের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।
একসময় এ অঞ্চলে চোর-ডাকাতের উপদ্রব ছিল বলে জানা যায়। বিশেষ করে চলনবিল এলাকার ডাকাত দল রত্নাই ও চন্দ্রাবতী নদীপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করত। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ আমলে এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়।
স্থানীয় ইতিহাসসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, মৃত লালন সিংহের স্ত্রী মাতঙ্গিনী সিংহ পুলিশ ফাঁড়ির জন্য ১১ বিঘা জমি দান করেন। পরে ১৯২৮ সালের ১৬ অক্টোবর আটঘরিয়া পূর্ণাঙ্গ থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে এটি উপজেলায় উন্নীত হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আটঘরিয়ার অবদান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আটঘরিয়া উপজেলার রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর এ অঞ্চলের ছাত্র, যুবক ও সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সংগঠিত হতে শুরু করেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন।
এর মধ্যে উপজেলার মাজপাড়া ইউনিয়নের বংশীপাড়া গ্রামে চন্দ্রাবতী নদীর তীরে সংঘটিত সম্মুখযুদ্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে বহু মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বংশীপাড়ায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগকারী বীরদের স্মৃতি বহন করে চলেছে এ স্থান।
বংশীপাড়া সম্মুখযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা
স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, বংশীপাড়া সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হওয়া ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম হলো—
১. শহীদ আবুল কাশেম
২. শহীদ আব্দুল খালেক
৩. শহীদ ইউনুছ আলী
৪. শহীদ নায়েব আলী
৫. শহীদ আব্দুর রশিদ
৬. শহীদ আব্দুল মালেক
৭. শহীদ শহিদুল ইসলাম
৮. শহীদ আব্দুস সাত্তার
৯. শহীদ মনছুর আলী
১০. শহীদ আব্দুর রাজ্জাক।
এ ছাড়া যুদ্ধের সময় ও পরবর্তী পরিস্থিতিতে আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ শহীদ হন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। শহীদের সংখ্যা ও তাঁদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য নির্ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সরকারি নথি ও স্থানীয় স্মৃতিফলক যাচাই করা প্রয়োজন।
আটঘরিয়ার ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান
কৃষিপ্রধান উপজেলা আটঘরিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা এবং জমিদারি আমলের নিদর্শন।
বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ: মাজপাড়া ইউনিয়নের বংশীপাড়া গ্রামে চন্দ্রাবতী নদীর তীরে অবস্থিত এ স্মৃতিসৌধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
গোড়রী আদি দুর্গা মন্দির: দেবোত্তর ইউনিয়নের গোড়রী গ্রামে অবস্থিত এ মন্দির স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ।
মৃধার মসজিদ বা শাহী মসজিদ: মাজপাড়া গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন এ মসজিদ এলাকার মুসলিম স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে।
খানবাড়ি মসজিদ: মাজপাড়া এলাকার এ মসজিদও স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।
চন্দ্রনাথ সেনের জমিদার বাড়ি: চাঁদভা ইউনিয়নে অবস্থিত এ জমিদার বাড়ি অতীতের জমিদারি ব্যবস্থার স্মৃতি বহন করে।
দেবোত্তর জমিদার বাড়ি: দেবোত্তর এলাকার এ স্থাপনাও আটঘরিয়ার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ।
রানি ভবানীর কাচারিবাড়ি: খিদিরপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এ কাচারিবাড়ি এলাকার অতীত ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কীভাবে যাবেন দর্শনীয় স্থানগুলোতে
বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধ: পাবনা জেলা শহর থেকে বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় দেবোত্তর বাজারে যাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে বংশীপাড়া স্মৃতিসৌধে পৌঁছানো সম্ভব। নির্দিষ্ট রুট ও দূরত্ব যাত্রার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নেওয়া ভালো।
চন্দ্রনাথ সেনের জমিদার বাড়ি: পাবনা শহর থেকে আটঘরিয়া বাজারে বাস বা সিএনজিতে যাওয়া যায়। সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে চাঁদভা বাজারের দিকে যেতে হবে।
মৃধার মসজিদ: পাবনা শহর থেকে আটঘরিয়াগামী বাস বা সিএনজিতে মাজপাড়া এলাকায় যাওয়া যায়। এরপর স্থানীয় যানবাহনে মসজিদে পৌঁছানো সম্ভব।
আটঘরিয়া উপজেলার এসব ঐতিহাসিক স্থান শুধু দর্শনীয় নিদর্শন নয়, বরং এলাকার মানুষের অতীত জীবনযাত্রা, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্বাধীনতাসংগ্রামের স্মৃতি বহন করে। ইতিহাস সংরক্ষণ, প্রামাণ্য তথ্য সংগ্রহ এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত করা গেলে এসব স্থানের গুরুত্ব আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
এমকে/বিএম২৪








