গ্যাসসংকটে কালিয়াকৈরের শিল্পাঞ্চল অচল, চাকরি হারানোর শঙ্কায় হাজারো শ্রমিক

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম
গ্যাসসংকটে কালিয়াকৈরের শিল্পাঞ্চল অচল, চাকরি হারানোর শঙ্কায় হাজারো শ্রমিক

সূত্রঃ সংগৃহীত

শাকিল হোসেন, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি


গাজীপুরের কালিয়াকৈরের শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাসসংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনার পর প্রায় এক মাস ধরে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় নিশ্চিন্তপুর, সফিপুর, মৌচাক ও কালিয়াকৈর সদরের গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনছেন কারখানা মালিকরা। পাশাপাশি চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন হাজারো শ্রমিক।


সরেজমিনে দেখা গেছে, কালিয়াকৈরের নিশ্চিন্তপুর এলাকার লিবাস টেক্সটাইল, নরু গ্রুপসহ বিভিন্ন বড় কারখানায় উৎপাদন কমে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। গ্যাসের চাপ না থাকায় সুতা, ডাইং ও ফিনিশিং বিভাগের অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। ফলে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যও নেই।


শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে সম্প্রতি কয়েকটি কারখানার মালিকপক্ষ শ্রমিকদের নিয়ে একসঙ্গে দুপুরের খাবারের আয়োজন করে। তবে এতেও চাকরি হারানোর আশঙ্কা কাটছে না শ্রমিকদের।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অপারেটর বলেন, ‘গ্যাস নেই, কাজও নেই। এভাবে চলতে থাকলে মালিক বেতন দেবেন কীভাবে? আমাদের সংসারই বা চলবে কীভাবে?’


গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। এতে উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব না হলেও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।


কালিয়াকৈরের একটি মাঝারি কারখানার মালিক জানান, স্বাভাবিক সময়ে কারখানায় মাসে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতো। বর্তমানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে। গত তিন মাসে শুধু জ্বালানি বাবদই ৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এভাবে লোকসান দিয়ে আর কতদিন কারখানা চালানো সম্ভব, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক খাত। রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে কাপড় ডাইংয়ের জন্য নিয়মিত গ্যাস প্রয়োজন হলেও গ্যাসসংকটে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অনেক ডাইং ইউনিট বন্ধ রয়েছে। এতে প্রক্রিয়াজাত কয়েক টন ভেজা কাপড় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


কারখানা মালিকরা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন। এতে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার পাশাপাশি কালিয়াকৈরের শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


তিতাসের গাজীপুর শাখার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা যতটুকু গ্যাস পাচ্ছি, তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ খুবই সামান্য।’


গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, গ্যাসসংকটের কারণে কালিয়াকৈরের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক কারখানা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে কতটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।


শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে শিল্পকারখানার জন্য পৃথক গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা চালু, গ্যাসের চাপ বাড়ানো এবং জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।


কালিয়াকৈর উপজেলায় গ্যাসসংকটে শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে নিশ্চিন্তপুর ও সফিপুর এলাকায় উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন শিল্প মালিক, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।



এমকে/বিএম২৪