ঠাকুরগাঁওয়ে হিমাগারে আলু রেখেও লোকসান, কেজিতে ক্ষতি ৫–৬ টাকা

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
ঠাকুরগাঁওয়ে হিমাগারে আলু রেখেও লোকসান, কেজিতে ক্ষতি ৫–৬ টাকা

সংগৃহীত

রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি


ঠাকুরগাঁওয়ে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান গুনছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ পড়ছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। অথচ বাজারে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা কেজি দরে। এতে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা লোকসান হচ্ছে তাঁদের। বাজারে চাহিদা কম থাকায় হিমাগারে মজুত আলু বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে সংশ্লিষ্টদের।


কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের শুরুতে মাঠপর্যায়ে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে আলু কেনাবেচা হয়েছে। পরে দাম বাড়বে—এমন আশায় অনেকে আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী দাম না বাড়ায় এখন বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। সংরক্ষণসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করে পুঁজি ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।


ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী এলাকার কৃষক আরমান হোসেন বলেন, মাঠে আলুর দাম কম থাকায় পরবর্তী সময়ে দাম বাড়ার আশায় তিনি হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, দাম বাড়লে সংরক্ষণের খরচ উঠে কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ দাঁড়িয়েছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। এখন সেই আলু ১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে তাঁকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।


রানীশংকৈল উপজেলার কৃষক ও ব্যবসায়ী মো. ওহাব বলেন, গত দুই থেকে তিন মৌসুম ধরে আলু চাষ ও হিমাগারে সংরক্ষণ করে লোকসানের মুখে পড়ছেন তাঁরা। এবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে তাঁর পুঁজি হারিয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কৃষক আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। আলুর দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।


সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের ব্যবসায়ী শামসুজ্জোহা বলেন, এ সময়ে হিমাগার থেকে প্রচুর আলু বাজারে আসার কথা থাকলেও চাহিদা কম থাকায় বিক্রি হচ্ছে ধীরগতিতে। তাঁর দাবি, এখনো প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আলু হিমাগারে মজুত রয়েছে। দ্রুত এসব আলু বাজারজাত করা না গেলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান আরও বাড়বে।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে।


জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ১৯টি হিমাগার। এসব হিমাগারে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুত রয়েছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় হিমাগার থেকে আলু বের হচ্ছে ধীরগতিতে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার মালিকেরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।


শাহী হিমাগারের ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, আলুর দাম কম থাকায় হিমাগার মালিকেরাও চিন্তিত। হিমাগার থেকে আলু বের না হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক—সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে হিমাগারের শ্রমিকদের ওপরও। শ্রমিকেরা জানান, হিমাগারে আলু ওঠানো-নামানোর কাজ কমে যাওয়ায় তাঁদের আয় কমে গেছে। ফলে আলুর বাজারে মন্দার কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষও আর্থিক সংকটে পড়ছেন।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আলমগীর কবির বলেন, কৃষকেরা লাভের আশায় আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে আগের তুলনায় দাম অনেক কম থাকায় তাঁরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।


এ পরিস্থিতিতে লোকসান কমাতে দ্রুত আলু বাজারজাতের পাশাপাশি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি করা গেলে হিমাগারে মজুত আলু বিক্রির সুযোগ বাড়বে। এতে আলুর সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।


এমকে/বিএম২৪